সেবন্তী ঘোষ >>আবেরদিন >> নভেলা

0
197

দুই পর্বে প্রকাশিত নভেলার প্রথম পর্ব

মোটা দানার ঈষৎ হলদে লালচে বালিতে ধাক্কা খেয়ে আদিগন্ত বিস্তৃত জলস্রোত ফিরে যাচ্ছে ফের। দূরে সম্মুখে ডানে-বামে কালচে সবুজ দ্বীপের আভাস বিরাটকায় দানোর মতো হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে যেন। আকাশে ধাতব পাত্রের মতো ট্যারা বাঁকা চাঁদ। সেই ম্লান আলোয় ঢেউ আছড়ে পড়া পাড় ভূমির উত্তরে অপেক্ষাকৃত উঁচু অংশে এক বয়স্ক মানুষকে ঘিরে কিছু মানুষ বসে, দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভ্রমসূচক দূরত্ব রেখেছে এই অন্ধকারের মতো দলটি। দূরে দূরে একটার পর একটা অর্ধবৃত্তে ছড়িয়ে আছে কিশোর, যুবতী প্রৌঢ়া, মায়ের কোলে ঝুলে থাকা ঘুমন্ত শিশু আর অতি বয়স্ক পুরুষরা।

যারা মধ্যবর্তী বয়স্ক পুরুষটিকে ঘিরে আছে তাদের আর আগের মতো টানটান শরীর নেই। এখন আর নেতার নির্দেশ পাওয়া মাত্র পাশের খাঁড়িতে রাখা ক্যানোর দিকে ছুটে যাবে না তারা। বন্য বরাহের মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়বে না জেনেও অতীতের স্বাধীন জীবনের স্পৃহাটুকু রক্তে রয়ে গেছে যেন। সংস্কারে এখনো সেই মুক্ত জীবন খেলা করে।

বয়স্ক লোকটি গোষ্ঠীপতি। সে তার ডোরাকাটা ইজের আর কর্কশ কাপড়ের জামা দ্বীপে ঢোকার আগেই সমুদ্রে বিসর্জন দিয়েছে। সাজা মকুবের সঙ্গে সঙ্গে ওরা তার পায়ের বেড়ি খুলে দিয়েছে কিন্তু তামাশা করার জন্য বোধহয় একহাতের হাতের বালা না খুলে অন্যটা কেটে দিয়েছে। লোকটা বালা পরা একটি হাতসহ মুক্ত অন্যহাত আকাশের দিকে তুলে ধরে। তার সবচেয়ে কাছের দলটি তাকে অনুকরণ করে। লোকটি সুর করে কথা সাজায়।

‘নগো দিয়ে কুক লারতা লা দিকা…
হৃদয় আজ দুঃখময়
ওই আকাশের দিকে তাকিয়ে
যা এই সমুদ্রের প্রতিরূপ,
সারাদিন ওই আকাশের ভাঁজ দেখে,
সমুদ্রের স্মৃতি রেখেছিলাম বুকে
ওই নোংরা ঘরগুলো থেকে আমি
বাঁশের কুটিরের স্বপ্ন দেখতাম
ও হো হো হো, ও হো হো হো
সমুদ্রের স্বপ্ন দেখতাম..
উড়ন্ত পাখিগুলির – …

পিছন থেকে দুই তিন সারির পুরুষরা সামনের সারির সঙ্গে ওই আধ-ভাঁজ করা কোমর নাড়িয়ে শেষ লাইনে সুর মেলাতে থাকল।

দ্বীপের ভিতর বসতি অঞ্চলে পাকা বাড়ি তৈরি হয়েছে। যদিও এদের ভাগ্যে তা জোটেনি। বাঁশের কুটিরেই  থাকে এরা। চাষ শিখতে হয়েছে। এই রেশনের চাল নিজেদেরই উৎপাদন করতে হবে কদিন পর।

গোষ্ঠীপতি জাম্বুর এই সুরবদ্ধ কবিতার উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে কিশোর, তরুণরা ও কেউ কেউ শরীরও মেলাতে লাগল। পিছনের দিকে থাকা বালকরা কেউ কেউ বসেই অনুকরণের চেষ্টা করতে লাগল, কেউ বালিতে আঁকিবুকি কাটল। মেয়েরা অবশ্য এত উৎসুক নয়। শিকার বা যুদ্ধের জীবন অনেক দিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। রেশনে মোটা চালের ভাত আসে। চিনি আসে। চা আর তামাকও আসে। প্রতি পরিবারে অসুস্থ বা নেশাগ্রস্ত লোক। প্রথম দিন থেকেই চিনির সঙ্গে তামাক পেয়েছে বিনা পয়সায়। গোপনে আফিম পাওয়া যায়। নিউমোনিয়ায় মারা যাচ্ছে দলে দলে। উৎসাহী আগ্রহী পুরুষ আর কয়েদিদের থেকে সিফিলিস নিয়ে এসেছে অনেকেই।

দ্বীপের ভিতর বসতি অঞ্চলে পাকা বাড়ি তৈরি হয়েছে। যদিও এদের ভাগ্যে তা জোটেনি। বাঁশের কুটিরেই থাকে এরা। চাষ শিখতে হয়েছে। এই রেশনের চাল নিজেদেরই উৎপাদন করতে হবে কদিন পর। গোষ্ঠীপতি জাম্বুকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে যে ঔদা্র্যে, তার বিনিময় তো থাকবেই কিছু।

দেরিতে হলেও মেয়েরা তবু একঝলকের জন্য জাম্বুকে দেখতে এসেছিল। আসেনি কেবল একজন। মধ্যবয়সিনী সেই মানুষটি নিজের কুটিরের দাওয়ায় শুয়ে থাকে। কিছুতেই কিছু যায় আসে না তার। গোষ্ঠী তার নাম দিয়েছে মোডো লিপা। লিপার নামের আগে মোডোর অর্থ অল্প বয়সে সন্তানহীন অবস্থায় স্বামী পরিত্যক্তা।

২.
কলকাতা থেকে রেঙ্গুন যাত্রাপথে জাহাজ ভেড়াতে হয় পোর্ট ব্লেয়ারে। নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির চোদ্দ নম্বর রেজিমেন্টের রাজনাথ তিওয়ারি এই সদ্য নোঙ্গর করা জাহাজে স্মিথ সাহেবের সঙ্গে সফর করছে। এখন অবশ্য সে আর সরকারি সিপাহী নয়। স্মিথের সহচর মাত্র। রেঙ্গুন যাওয়া হবে মাসখানেক পর। রাজনাথ রেঙ্গুন যাত্রাপথে এখানে আসতে চায়নি মোটেই কিন্তু স্মিথ জানিয়েছে পোর্টব্লেয়ারের বর্তমান রেসিডেন্ট অফিসার হোমফ্রের কিছু জিনিসপত্র চাই। বহু আগেই সে কলকাতা অফিসে জানিয়ে রেখেছে। ফলে খানিক বাধ্যতই রাজনাথকে এখানে থামতে হলো।

রাজনাথ তখনো জানতো না হোমফ্রের দুরভিসন্ধি কতোদূর! জাহাজ থেকে নামবে না ঠিক করেছিল রাজনাথ। স্বজাতি সারেঙের ঘরে স্বপাকে রান্নায় বসে বৌ ভবানীর গোলগাল ঘি-রঙা মুখটির কথা ভাবে। মায়া জড়ানো বালক পুত্রটির মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। দেশ ছাড়ার সময় থেকে এই ছবি দুটি তাকে দ্রব করে রেখেছে। কিন্তু ভাবা ছাড়া উপায় বা কি? তার মুক্তির শর্তই এমন। চাকরি জীবনের বাধ্যবাধকতাকে কে আর নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?

সিপাহী বিদ্রোহের আগে ইংরেজের সিপাহী রাজনাথ নানা জাতের সঙ্গে মেলামেশার বাধ্যতায় বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। অথচ উপায় নেই। ছত্রিশ জাতের জন্য আলাদা রেজিমেন্ট ব্রিটিশ সরকারের মাথায় ঢুকবে না। প্রথম দিকে উচ্চবর্ণরা আলাদা ব্যারাকে ছিল। খাওয়া-দাওয়া স্বপাকে বা স্বজাতের লোকেরা পালা করে করতো কিন্তু পুবের সিপাহীরা বেশি করে চলে আসার পর গোলমাল লেগে গেল। ওরা নিজেরা বামুন কায়েত হলেও তেমন জাতপাতের বোধ নেই। বামুনরা বলে বটে কায়েত নিচুতে, একটু পরেই গলাগলি করে খেতে বসে যায়! নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে। রাজনাথের সর্বক্ষণ তটস্থ হয়ে, জাত গেলো গেলো ভাব তখন! যদিও এই মেলামেশার কারণে পরবর্তী জীবনে অনেক কিছু সহ্য করতে পেরেছে সে।

কোন উত্তেজনা নেই, বৈচিত্র নেই। মাঝেমধ্যে ভাবেই বেশিরভাগ সময় গুমোট ঝাঁঝালো গরম আর সামুদ্রিক ঝড়ের অনিশ্চয়তা থেকে সে পালাবে। কিন্তু পালাবে কোথায়?

স্মিথ, হোমফ্রের সঙ্গে কেজো কথা সেরে নিজের বিভাগের সহকর্মীদের ব্যারাকে চলে গেল। এই সমুদ্র মধ্যবর্তী দ্বীপ ভূমিতে বাইরের লোকজন নেই বললেই চলে। প্রতিদিন অফিস ব্যারাক পথ ঘাট পার্টিতে এক মুখ। জাহাজঘাটা, উত্তাল স্রোত, আর কয়েদী, আদিবাসী দেখে হোমফ্রে বিমর্ষ হয়ে থাকে।

কোন উত্তেজনা নেই, বৈচিত্র নেই। মাঝেমধ্যে ভাবেই বেশিরভাগ সময় গুমোট ঝাঁঝালো গরম আর সামুদ্রিক ঝড়ের অনিশ্চয়তা থেকে সে পালাবে। কিন্তু পালাবে কোথায়? ডাবলিনের কাছে এক গ্রামের মানুষ সে। নিম্নবিত্ত পরিবারে আট ভাই বোনের একজন। ভাগ্যান্বেষণে সে অল্প শিক্ষা নিয়ে, এমন আরামের জীবন পেয়েছে। কোথায় সে কৃচ্ছ্বসাধনের জীবন আর কোথায় পাংখাপুলার আর গা হাত পা টিপে দেওয়ার চাকর থেকে খানসামা,বাবুর্চি হুকোবরদার ভরা জীবন! তার মধ্যে জংলি বিদ্রোহীগুলো এখন শান্ত, পোষ মানা। তার আয়ত্তের মধ্যে খানিক। হঠাৎ তার মনে হল রাজনাথকে নামিয়ে নিয়ে আসলে কেমন হয়!খানিক আমোদ হতে পার। রাজনাথ বিষয়ে স্মিথ ছাড়াও খবর পাওয়ার লোক আছে তার।

যেমন ভাবা তেমন। হোমফ্রে ওর সর্বক্ষণের সঙ্গী চমনলালকে ডেকে পাঠালো। চমনলাল খুনের আসামি ছিল। এখনকার কয়েদী দু-রকম। মূল ভূখণ্ডে ডাকাতি, খুনের মামলার অথবা ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আসামি। আগের ওয়াহাবি আন্দোলনের বা প্রথম দিকের সিপাহী বিদ্রোহের কয়েদিগুলো রস দ্বীপে সেটেলমেন্ট তৈরির অবর্ণনীয় অত্যাচারে বেশিরভাগ মরে বেঁচেছে। চমনলালের স্বাধীনতা যোদ্ধাদের সঙ্গে তেমন ভাব ভালোবাসা ছিল না, ওই লোকগুলোর ধরন-ধারণই আলাদা।

চমনলাল এখন হোমফ্রের আশ্বাসভাজন মুক্ত কয়েদি। সে আর এক খুনের আসামি কয়েদিকে বিয়ে করে সংসার পেতেছে।

চমনলাল দেখে, হোমফ্রের পাশে বদমাশ ফস্টার নিচু চেয়ার টেবিলে বসে মাথা ঝুঁকিয়ে কী সব লিখছে। ওর বেতের মার এখনো চমনলালের পিঠে আড়াআড়ি চিহ্ন রেখে গেছে।এখন অবশ্য দিন বদলেছে। তবু সাহেব সাহেবই। সহজে ওকে শায়েল্তা করা যাবে না।

হোমফ্রে বলে, কাউকে একটা পাঠিয়ে জাহাজ থেকে রাজনাথকে নামিয়ে আনো।
চমনলাল স্থিরভাবে তাকিয়ে বলে, তাহলে কথাটা সত্যি? রাজনাথ এখানে এসেছে?
হোমফ্রে হাসে। বলে তুমি আমার আগে থেকেই জানো হে! সে আমিও জানি। এখন ব্যবস্থা করো তো।
চমনলাল মুখের ভাব লুকিয়ে বলে, ওকে নিয়ে কী করবেন ভেবেছেন? ও কিন্তু এখন অনেক বড়ো সাহেবের পিয়ন। স্মিথ সাহেব পছন্দ নাও করতে পারেন।
হোমফ্রে আবার হেসে বলে, বাদ দাও তো! স্মিথ রাগ করবে কেন? এখানে কি অকারণে নেমেছে? সবার স্বার্থ আছে চমনলাল! সে যাক। তুমি ওটাকে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা করো। স্মিথের সঙ্গে আসা মদের পিপেও নামাও –
চমনলাল সতর্ক গলায় বলে, দেখবেন সাহেব, বহু কষ্টে আপনার দয়ায় সংসার করতে পেরেছি। আর কোন ঝামেলায়…
চমনলালের কথা শেষ হয় না, ফস্টার বিরক্ত গলায় বলে, আ!বড়ো বেশি কথা বলো। স্যর যা বলছেন করো। দয়ায় ছাড়া পেয়েছো কি নিজেদের নির্দোষ মনে করতে শুরু করেছো!
চমনলাল খানিক অনিচ্ছা ও খানিক উত্তেজনায় কাজ সারতে চলে যায়।

রাজনাথ গম্ভীর। খাওয়া-দাওয়ার পর তাকে সেটেলমেন্ট এরিয়ায় নিয়ে এসেছে চমনলাল। চমনলাল কে সে চিনতে পারেনি। পারার কথাও নয়। চমনলাল এক নৃশংস পারিবারিক খুনের আসামি। রাজনাথের ভাবলেশহীন মুখ দেখে মনের আভাস পাওয়া এখন মুশকিল।

দাড়ি-গোঁফ ওপড়ানো গাছপালার চিহ্নহীন খোলা জায়গায় গায়ে গা লাগা বাঁশ-বেত নারকেল পাতা ছাওয়া কতগুলি কুড়ে ঘর। দূরে সমুদ্রের ঢেউ পাড় ভিজিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। পাড়ে ডাবের খোলা থেকে শুরু করে নানা আবর্জনা। পচা একটা ভ্যাপসা গন্ধ গরম ফুঁড়ে উঠছে।

অন্যরা স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই রঙিন সুতোর বিনুনী করা মেয়েটা উদ্ধত ভঙ্গিতে রাজনাথের সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখ কুঁচকে তাকে দেখতে থাকে। অন্যরা এগোয় না, পিছিয়ে যায় না। কিছু ভাবার আগেই রাজনাথের রোদে-মাজা গমরঙা সুপুরুষ দীর্ঘ দেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। সর্বশক্তি দিয়ে কিল চড় ঘুষি মারতে থাকে।

রাজনাথকে দেখে সার দিয়ে বেরিয়ে আসে তারা। অনেকেরই শরীর ক্ষয়িষ্ণু, গায়ে বেঢপ ঝ্যালঝেলে জামাকাপড় অবাঞ্ছিতের মত ঝুলে আছে। নিরস্ত্র, ভাঙাচোরা মানুষগুলির অন্ধকারের মত কঠিন মুখ, জেগে ওঠা হনু, বৃষ্টি‌ বনের দুর্দম ফার্নের মত ঘন কুঞ্চিত কেশ, থ্যাবড়া চ্যাপ্টা সুদৃঢ় পা তাদের প্রাচীন গোষ্ঠীর শৃঙ্খলায় সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখে। শরীরে তাদের আর বন্য বরাহের ক্ষিপ্রতা নেই, হরিণের নমনীয়তা অন্তর্হিত কিন্তু চোখমুখে তীব্র কাঠিন্য। রাজনাথকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে উত্তেজিত কথাবার্তা শুরু হয়ে যায়। দৃশ্যতই রাজনাথ বাক্যহত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

কোঁকড়া চুলে রঙিন সুতোর গিঁট-মারা একটি মেয়ে সামনে এগিয়ে আসে।

হোমফ্রে চেঁচিয়ে বলে, এই লোকটি তোমাদের ভাষা জানে। এর কাছে শোনো তোমরা। সভ্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে কতো উন্নতি করতে পারবে। স্কুল হচ্ছে, চার্চ – সব তোমাদের জন্য।

অন্যরা স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই রঙিন সুতোর বিনুনী করা মেয়েটা উদ্ধত ভঙ্গিতে রাজনাথের সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখ কুঁচকে তাকে দেখতে থাকে। অন্যরা এগোয় না, পিছিয়ে যায় না। কিছু ভাবার আগেই রাজনাথের রোদে-মাজা গমরঙা সুপুরুষ দীর্ঘ দেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। সর্বশক্তি দিয়ে কিল চড় ঘুষি মারতে থাকে।

হোমফ্রে হতভম্ব! এতটা ভাবেনি সে। মুহূর্তমধ্যে সংবিত ফিরে পায়। তার দেহরক্ষীরা ছুটে আসতে থাকে। রাজনাথ ময়দানে লড়াই করা সিপাহী। দীর্ঘ লড়াই ও আত্মরক্ষার সংগ্রামে সে সফল। একরাশ ঘৃণা ও বিরক্তি নিয়ে মেয়েটিকে সে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। সরিয়ে দিয়েই সে হোমফ্রের দিকে চলে যাবার অনুমতির প্রত্যাশায় তাকায়। চারদিকে সে স্মিথ সাহেবকে খোঁজে। যদিও সে জানে এই অবস্থায় স্মিথ হোমফ্রেকে কিছুই বলবে না। স্মিথের দয়ায় সে মুক্তি পেয়েছে মাত্র।

এবারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা আদিবাসীদের দলটিতে প্রবল উত্তেজনা দেখা দেয়। নিজেদের মধ্যে রাজনাথকে নিয়ে কথা বলাবলি শুরু হয় যার অধিকাংশই হোমফ্রে বা চমনলালের দলবল বুঝতে পারেনা। পারে শুধু রাজনাথ।

হোমফ্রের রক্ষীরা সামনে চলে আসায় রাজনাথের উপর আর আঘাত আসে না কিন্তু বিক্ষোভ বাড়তে থাকে ক্রমশ। হোমফ্রে একটু অস্বস্তিতে পড়ে। দেখে চমনলাল আড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এমনটা যে হতে পারে তার ইঙ্গিত অবশ্যই সে দিয়েছিল। একটু যে রাজনাথকে নিয়ে মজা করার লোভ তার ছিল না এমন নয়, কিন্তু এমন ঝামেলা হবে সেটা সে ভাবেনি।

এমন সময় গোষ্ঠীপতি জাম্বু সামনে এসে দাঁড়ায়। নিজের ভাষায় বলে, একবার লিপার সঙ্গে দেখা করবে না?
পিছন থেকে সেই মেয়েটি বলে. ওকে ছেড়ো না তোমরা। লিপাকে কিভাবে ফেলে রেখে গেছে ভুলে গেছো? দেখা করবে না মানে?
জাম্বু মেয়েটিকে নিরস্ত করে বলে, আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে তুমি কথা বলছ কেন? এবারে রাজনাথের দিকে ফিরে বলে, জিগা তো মরেই গেছে। লিপা বেঁচে মরে আছে।
ঘাড় গোঁজকরা রাজনাথ এতক্ষণের নানা বাক্যবাণে মাথা তোলে এবার। চোখ রক্তবর্ণ। তামাটে মুখমণ্ডলে কিয়ৎক্ষণ পূর্বের আঘাত চিহ্নের রক্ত দাগ। সে পিঠের দিকে জামা খানিক তুলে নিতম্ব নির্দেশ করে বলে, শয়তানরা ছ-সাতটা তীর মেরেছে। এখনো গর্ত হয়ে আছে। কিছু করার ছিলনা। যুদ্ধে ধরাপড়া সৈনিক আর কি বা করতে পারতো? ঘেন্না, ঘেন্না করি নর রাক্ষসগুলোকে! উলঙ্গ! অসভ্য! বর্বর! কাউকে চিনিনা, এদের কাউকে না।

তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়ে যায় অন্ধকারের মতো মানুষগুলির দিক থেকে। এবারে জাম্বু উত্তেজিত জনগণকে শান্ত হতে বলে। রাজনাথকে বলে, আমাদের মধ্যে শুধু এইটুকুই দেখেছিলে তুমি? শুধু এইটুকু?
জাম্বুর গলায় যে তীব্র হতাশা দুঃখ অভিমান ছিল, ভাষা না বুঝলেও হোমফ্রে চমনলাল তার সুর ধরতে পারে।

হোমফ্রের জুনিয়র অফিসার হেস্টি ম্যাকলয়েড নিচু গলায় রাজনাথ সম্পর্কে কিছু বলে। হেস্টি এখানে এসে‌ ইস্তক কাগজ পেন্সিল নিয়ে ঘোরে। তার অনুসন্ধিৎসা প্রবল। আদিবাসীদের বিভিন্ন দলের ভাষা ও শব্দ নিয়ে তার আগ্রহ আছে। রাজনাথের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চায় সে।

রাজনাথের চোখ-মুখ রাগে অপমানে অস্বাভাবিক দেখায়, বলে, তোরা আর আমরা? জঙ্গলে ন্যাংটো হয়ে থাকা, কাঁচা মাংস খাওয়া কুশ্রী দানব?

জাম্বু শান্ত হয়ে যায়। স্থির চোখে রাজনাথের দিকে তাকায়। রাজনাথের ঘৃণা কুঞ্চিত মুখ দেখে। কেটে যাওয়া কপালের রক্ত অবধি মোছেনি রাজনাথ।

হোমফ্রের জুনিয়র অফিসার হেস্টি ম্যাকলয়েড নিচু গলায় রাজনাথ সম্পর্কে কিছু বলে। হেস্টি এখানে এসে‌ ইস্তক কাগজ পেন্সিল নিয়ে ঘোরে। তার অনুসন্ধিৎসা প্রবল। আদিবাসীদের বিভিন্ন দলের ভাষা ও শব্দ নিয়ে তার আগ্রহ আছে। রাজনাথের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চায় সে।
হোমফ্রে ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। বলে, তুমি রাজনাথকে নিয়ে যাও। ব্যারাকে গিয়ে কথা বল।
হোমফ্রে এবারে চমনলালকে দিয়ে জাম্বুকে বলে, লিপাকে ডাকো। সে নিজে এসে রাজনাথকে দেখে যাক।
জাম্বু একবার হোমফ্রের দিকে তাকিয়ে তার মনের ভাব বোঝার চেষ্টা করে। সেই রঙিন সুতো দিয়ে চুল বাঁধা মেয়েটিকে বলে, সেলা, লিপাকে খবর দাও।
রাগে গজরাতে গজরাতে মাঠ পেরিয়ে বসতির দিকে এগোয়।

রাজনাথকে বসার জন্য চেয়ার পেতে দেওয়া হয়েছে। হোমফ্রে মজার উপাদান না পেয়ে কেটে পড়েছে। সে লিপাকে ডাকার অর্ডার দিয়েছে জেনে বুঝেই। জাম্বুকে আর সে চটাতে চায় না। চমনলালের বন্ধু জালাল হোসেন জেলের পাহারাদার দেয়।রাজনাথের সঙ্গে সে এখন গল্প জুড়বার চেষ্টা করে। রাজনাথ শুনছে কি শুনছে তার যায় আসে না। এখানে কয়েদী ছাড়া মুক্ত মানুষের সঙ্গে আলাপ হয় না একেবারেই। তাও রাজনাথ এসেছে মূল ভূখণ্ড থেকে।

রাজনাথ দু’হাতে মুখ ঢেকে রোদ আড়াল করে বসে। জালাল হোসেন বলতে থাকে মুলতানে এক পরিবারের সাত সদস্য খুনের আসামি সে। ডাকাতি ছিল তার পেশা। ব্রিটিশ সরকার তাকে ছেড়ে দিলেও দেশে ফেরার উপায় নেই। ওই পরিবারের জীবিত সদস্যরা ছিঁড়ে খাবে। সরকারি অফিসারদের কাছের লোক সে।

জালাল ফিসফিস করে বলে, গাধাগুলো জানেনা কিছুই! শুধু মেয়েটার দুরবস্থার জন্য তোমাকে দোষী মনে করছে। আসল ঘটনাটা তো জানেই না। আমরা জানি। রাজনাথ কড়া চোখে জালাল হোসেনের দিকে তাকায়, তারপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। সেলাকে এখন একটু একটু মনে পড়ছে তার। সম্ভবত সেই লিপার দিদির মেয়ে। গোল গোল চোখ। তালু আর পায়ের তলা সাদা। কালো হাত পা। রাজনাথের আবার ভবানী আর ছোট ছেলেটার কথা মনে পড়ে। শিবজির দিব্যি! রেঙ্গুন হয়ে দেশে ফিরলে আর এই শয়তান গোরাগুলোর ফাঁদে পড়বে না। এত বড় একটা কাজ করে দিয়েছে সে। তার বদলে তাকে এইভাবে বেইজ্জত করা!

জালাল তেমনি ফিসফিস করে বলে, এর পিছনে শুঁটকো রজার সাহেবের বুদ্ধিও থাকতে পারে। হোমফ্রে সাহেবকে বলে তোমাকে এখানে এনে ফেলা। ব্যাটা বাপের মত কসাই একেবারে! নিজেই একদিন নেশার ঘোরে বলেছে মা বেশ্যা, বাপ কসাই! তোমরা রস থেকে অতোজন পালিয়ে যাওয়ায় আর পদোন্নতি হয়নি ওর। নিচে নেমে এসে হোমফ্রেরও তলায় চলে এসেছে। সাদা চামড়ার জন্য ওই বেজন্মাগুলো আমাদের শাসন করছে।

রাজনাথ উত্তর দেয় না। জীবন তাকে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেখাতে শিখিয়েছে। সে জানে ইহ জীবনে গোরাদের কোন শিক্ষা সে দিতে পারবে না।
সেলার সঙ্গে আরও দুই তিনজন মেয়ে মাঠ পেরিয়ে আসে। এতক্ষণ জাম্বু রাজনাথের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাও করেনি, আবার দৃষ্টি ও সরায়নি।
সেলা জাম্বুকে কিছু বলে। জাম্বু শান্তভাবে শোনে। এবারে বুকের ওপর আড়াআড়ি হাত রেখে রাজনাথের দিকে দৃষ্টি ফেরায়। বলে, মোডো লিপা রাজনাথের সঙ্গে সাক্ষাতে অসম্মতি জানিয়েছে। তারাও লিপাকে বাধ্য করবে না।
রাজনাথের দিকে তাকিয়ে স্পষ্টভাবে বলে জাম্বু, তোমাকে ইংরেজি শিক্ষা নিয়ে ওরা বলতে বলেছে। ওদের ঐ শিক্ষা নিয়ে আমরা কি করব? ওদের ওই শিক্ষা দিয়ে আমাদের এই দুর্দশা করেছে ওরা। ওই শিক্ষা তোমরা শেখো। আমাদের আর উপকারের চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই। সব শেষ হয়ে গেছে। অবিশ্বাস কথার অর্থ তো তুমিই শিখিয়ে দিয়ে গেছো আমাকে।

সহসা রাজনাথের মুখ রক্তশূন্য হয়ে যায়। এর চেয়ে ঢের ভালো ছিল সেলার আক্রমণ। তবু রাজনাথ প্রাণপণে মাথা উঁচু করে জাম্বুর চোখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে যায়।

৩.
আগা, অনন্ত পান্ডে, হেমন্ত, যশবীরের নেতৃত্বে কথা শুরু হয়ে যায়। জমায়েত নয়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পরিকল্পনার আদানপ্রদান। কীভাবে নৌকা তৈরি হবে, খাবার ও পানীয় জল সংগ্রহ হবে, সেগুলি রাখার জন্য মশক তৈরি হবে, ছুরি জাতীয় অস্ত্র জোগাড় করা যাবে ইত্যাদি। হেমন্ত আর যশবীরের দল জঙ্গল পরিষ্কারের ডিউটিতে। ক্যানো বাঁধার জন্য তারাই কাছি সরিয়ে রাখে। মঙ্গল আর শিবরাম লগ লুকিয়ে রাখে। নৌকা তৈরি হয়। দেখলে মনে হবে দড়ি দিয়ে বাঁধা কতগুলি কাঠের গুঁড়ি মাত্র।

রাজনাথ তিওয়ারি সিপাহী বিদ্রোহে অভিযুক্ত হয়ে সশ্রম কারাদণ্ড পায়। ঝিলম কমিশন তাকে ১৭৫৮ এর ১৬ এপ্রিল, পেনাল সেটলমেন্টে পোর্ট ব্লেয়ারে পাঠায়। করাচিতে কাজ করা সিপাহী রাজনাথের নম্বর হয় ২৭৬। রসে পৌঁছবার কুড়ি দিনের মাথায় পালানোর পরিকল্পনা শোনে রাজনাথ। আগা, হেমন্ত দুবে প্রথমে তাকে নিতে চায়নি কিন্তু সর্দার যশবীর তার পূর্ব পরিচিত, সেই অন্যদের রাজি করায়। দলনেতা আগা জানায়, রস পেরিয়ে উল্টোদিকের কোন দ্বীপে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে আট নয় দিনে রেঙ্গুন।

রস আইল্যান্ডে মিষ্টি জল কম থাকায় পোর্টব্লেয়ার থেকে নৌকাযোগে জল আনা হতো। ওই জলবাহকদের মাধ্যমে চাথাম দ্বীপ ও ফেনিক্স বের বন্দীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। পালাবার দিন সেদিন চাঁদ ছিল তাদের সঙ্গী।

দু’দিন উত্তাল সমুদ্রে ঢেউয়ে মোচার খোলার মত ওঠে নামে ক্যানোগুলি। এর মধ্যে ছিটকে পড়ে গেছে কয়েকজন। তাই নিয়ে শোক করার মানসিকতা নেই কারো। কথামতো দিনের শেষে ফেনিক্স বে আর চাথাম থেকে আরও চল্লিশ জন এই দলে যোগ দেয়। হেমন্তের বন্ধু ফেনিক্সের ইসমাইল খানের উপর শুকনো খাবার জোগাড়ের ভার ছিল।

মানুষগুলি এখন আর মানুষ নেই যেন। তৃতীয় দিনে চোখের সামনে দ্বীপ ভেসে উঠলো কিন্তু স্রোতের বিরুদ্ধে এগোনো আর পিছোনোর মধ্যে তফাৎ করা যাচ্ছিল না।

তৃতীয় দিনেই ক্যানোগুলি ওই দ্বীপের বেলাভূমি সংলগ্ন খাঁড়িতে এসে ভিড়ল। এই আড়াই দিন রাজনাথ, কলকাতা বন্দর থেকে রসে আসার সময়ে জাহাজের খোলের ভিতরের অবর্ণনীয় দুলুনি ও তার নারকীয় পরিবেশের কথা ভেবেছে। সে ছিল দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ। আজ তার সমুদ্রযাত্রা নিজের স্বাধীনতা অর্জনের। নিজে স্বাধীন হয়ে সে আবার দেশের কাজ করতে চায়। গ্রামে সে মাটি মেখে পালোয়ানি শিখেছে। রাজার মতই চেহারা ছিল বলে তার ঠাকুমা এই নাম দিয়েছিল। দুধের মত সাদা রং ছিল তার। বাড়ির ধবধবে সাদা গরুটা ভারি নেওটা ছিল তার। কালি শামলী গাইকে পছন্দ করতো না সে। তবু একেক সময় শামলীর নধর চিকন গায়ে যখন আলো ঠিকরাতো বেশ লাগতো দেখতে। যুদ্ধের হানাহানির চেয়ে এখন এসব কথাই বেশি মনে পড়ছে কেন কে জানে।

চব্বিশ পুরুষে এমন নোনাজল দেখেনি সে। জাহাজের খোলে বন্দী অবস্থায় বাইরে দেখার অনুমতি ছিল না, তবে জলের আক্রোশ দোলানি, নোনা স্বাদ টের পেতো ভিতরে বসেই। সারা শরীর মন দিয়ে অনুভব করতে হতো জলকে। তাই রসে আসার মাত্র কুড়ি দিনের বন্দিজীবন তাকে কাবু করতে পারেনি। একা হাতে সে ইংরেজের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। কে জানতো গোপন কোষাগার ছিল সেখানে? ইংরেজের সিপাহী রাজনাথ আর জীবন রাম মুচিকে এক ঘরে থাকতে দিয়েছিল স্যাডহাম সাহেব। নতুন নিয়ম জারি করলো যে খেতেও হবে পাশাপাশি! লড়াই করার সময় সে সিপাহী। তার বাপ ও ভাড়াটে সিপাহী হয়ে দেশ চষেছে। লুটপাট অগ্নিসংযোগ হত্যা এসব তাদের পেশার অন্তর্গত, কিন্তু মুচি মেথরের সঙ্গে একসঙ্গে খাবে, শোবে?

‘সাদাম’ সাহেবের বাড়িতে আগুন লাগানোর সময় তার দুটি কন্যার ভয়ার্ত নীল চোখ মনে পড়ে শরীরে বল ফিরে এলো রাজনাথের। লাফ দিয়ে কেন থেকে কাদা মাটিতে নেমে পড়লো, সাবধানে বুড়ো আঙুল কাদামাটিতে গেঁথে পাড় বরাবার নৌকা টেনে নিয়ে এলো।

থমথমে প্রকৃতি। সামুদ্রিক নোনা বাতাসে গা জ্বলে যাচ্ছে। কাদামাটিতে জেগে আছে তীক্ষ্ণ শেকড়। গাছের শুকনো ফোকরে গায়ে আঁককাটা সরীসৃপ। তিন দিনের যাত্রায় গায়ে ফোস্কা, তাতে নুন লেগে চড়চড় করছে আরো।
আগা গুনতি করে। মোট একশো তিরিশ। রাজনাথ ছাড়া সদ্য আসা বন্দি আরো বারোজন তুলনায় সতেজ বলা যায়। অন্যরা রসের হাড়ভাঙা খাটুনিতে শরীর ক্ষইয়ে ফেলেছে।

আগা বলে, তিন ভাগ হয়ে পাশাপাশি যেতে হবে। তাহলে পরস্পরের প্রতি নজর থাকবে বেশি। পিছিয়ে যাবে না কেউ। দরকারে তাকে মাঝে আনা হবে। প্রয়োজনে ধীরে যাবো। রসদ আছে এখনো। তবে যা দেওয়া হবে তার বেশি কেউ চাইবে না।
সম্মতির ঘাড় নাড়ে সবাই, কারণ না করার কোনো উপায় নেই।

৪.
আগার হিসেব মতো আট থেকে ন-দিন হাঁটতে হবে। প্রথম দিকে সবাই লম্বা লাইন করে সমুদ্রপাড় বরাবর জঙ্গলে ঢোকে। খাঁড়ি ধরে খানিক এগিয়ে জঙ্গলের ভিতর থেকে বয়ে আসা মিষ্টি জলধারার পাড় ধরার চেষ্টা করে। হেমন্ত আর ইসমাইল চিহ্ন রাখার জন্য পথের পাশে গাছের শুকনো ডাল পুঁততে পুঁততে যায়। সমুদ্রঘেরা বর্ষা বনে বিছে, জোঁক, দানবীয় পোকামাকড়, ডোরাকাটা ক্রেটে ভরা। দ্বীপে পৌঁছে ওরা খানিক শঙ্কায় থাকলেও মনে সান্ত্বনা ছিল ।

প্রথম দিনেই সাপের ছোবলে গুরনাম ও রামলাল শিউ মারা যায়। মৃতদেহ কোনমতে ধরাধরি করে খাড়ির চরে পুঁতে ফেলে ওরা। সাপে-কাটা মানুষ জলে ভাসাবার বা পোড়াবার কোনো সম্ভাবনাই নেই। সমুদ্রের গভীরে না দিলে ঢেউ তাকে ফিরিয়ে দেবে। আর ধোঁয়া উঠলে ওদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যাবে।

দেশজুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে লড়াই শুরু হয়ে গেলো ইংরেজদের বিরুদ্ধে। যুদ্ধকে সে অল্প সময় ধরে দেখেছে কিন্তু তার অভিঘাত ছিল গভীর ও ভয়াবহ। অসম শক্তির বিরুদ্ধে এই লড়াই আসলে বিদ্রোহ।

আগা এবারে যথাসম্ভব সন্তর্পনে চলার আদেশ দেয়। তখনো এদের ধারণা নির্দিষ্ট দ্বীপে এসে পৌঁছেছে। এত কষ্টেও মনে একচিলতে আশার আলো। জঙ্গলের পাশে খাঁড়ির ধারে বুনো শুয়োর ধরার ফাঁদ পাতে। শুয়োর ধরা সহজ নয়। বেশ শ্রমসাধ্য এবং বহু ধৈর্যের পরীক্ষার পর জোটে। হালকা-পাতলা ইসমাইল তরতর করে দেশী খেজুর গাছে ওঠে। রাজনাথ ওর ছেঁড়া জামার ওপর মোটা করে গাছের খোল-পাতা, লতা দিয়ে বেঁধে দেয়। রাজনাথের শিকার করা শুয়োরের মাংস এখন নির্বিকারে খায় ইসমাইল, আগা। কিন্তু এই বিনিময় আর সহমর্মিতা বেশিদিন রক্ষা করা যায় না।

রাজনাথের হরিদ্রাভ রং জাহাজের খোলে আসতে আসতেই পুড়তে শুরু করেছিলো। তার সিপাহী জীবনের শুরুতেই দেশজুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে লড়াই শুরু হয়ে গেলো ইংরেজদের বিরুদ্ধে। যুদ্ধকে সে অল্প সময় ধরে দেখেছে কিন্তু তার অভিঘাত ছিল গভীর ও ভয়াবহ। অসম শক্তির বিরুদ্ধে এই লড়াই আসলে বিদ্রোহ। বিদ্রোহের সময় যদি কোন নিশ্চিত আশ্রয়দাতা, প্রভু বা সর্বজন মান্য নেতা না থাকে তাহলে সাধারণ সৈনিককে কূটকৌশলে অতিরিক্ত দড় হতে হয়।

রাজনাথ সামান্য লেখাপড়া ও অভিজ্ঞতায় বুঝে গেছিল আত্মরক্ষা সর্বাগ্রে। সে গাছ থেকে পাড়া বিনিময়ের খেজুর কটিবন্ধে লুকিয়ে রাখতে শুরু করে। কেউ কাউকে খাবারের ভাগ সহজে দিতে চায় না আর।

মানুষগুলি যেন প্রেত। জোঁক মশা গায়ে ঝুলে থাকে। খুব অস্বস্তি হলে নোনা খাড়ির জলে গা ধুয়ে নেয়। কামড়ের ক্ষতস্থানে জ্বালা বাড়ে দ্বিগুণ। কেউ কারও বন্ধু নয়। শত্রুও নয় কারো। কারণ দল থেকে বিচ্ছিন্ন হলে মৃত্যু বুক থেকে গলায় এগিয়ে আসবে মাত্র। যা বুঝতে পারছিল অনেকে কিন্তু স্বীকার করতে চায়নি, নিজের কাছেও সেটি স্পষ্ট হয়ে গেল সাত দিনের মাথায়।

পেটের ব্যথায় মৃত মঙ্গলের চিহ্ন রেখে যাওয়া গাছের ডালগুলির কাছে আবার ফিরে এসেছে ওরা! মরিয়া হয়ে খানিক এগিয়ে গেলে গুলাব সিংকে পুঁতে রাখার জায়গাটাও বেরিয়ে এলো! সাপের কামড়ে মারা গুলাবের পচা-গলা লাশের কিছু অংশ এখন মাটির উপরে। পোকা ভনভন করছে। ভয়ানক দুর্গন্ধ। জোয়ারের জল অগভীর কাঁচা সমাধি উলঙ্গ করে দিয়েছে। গন্ধে আর নাকচাপা দেওয়ার মত চেতনা না থাকলেও বা নিজেদের গায়ের গন্ধে নতুন করে অবশ্য এই গন্ধকে আর অসহ্য মনে না হলেও কেউ কেউ বমি করে ফেললো।

যশবীর নেতাদের ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছে। এ কদিনে নেতাদের ত্যাগ করে ক্ষুব্ধ রাজনাথের সঙ্গ নিয়েছে সে। আগা ও অনন্ত পাণ্ডে, ইসমাইলের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় রাজনাথ। বলে, ‘তাহলে তোমরা ঘুরিয়ে মারছো তো আমাদের? হিসেব নেই! ম্যাপ কম্পাস নেই! খবর না নিয়ে এভাবে মরতে চলে এলাম আমরা?

আগা রুক্ষ স্বরে বলে, রসে কি আমরা বাঁচতে এসেছিলাম? অ্যাঁ? পাকা ছাউনি নেই, বর্ষায় জলের সঙ্গে তাঁবুর ভেতর সাপ কিলবিল করছে! কবুতরের পাখির মতো মশা! দওয়াই নেই! তার মধ্যে অকথ্য পরিশ্রম! দলে দলে পচে মরার চেয়ে পথ খোঁজা ঢের ভালো! বাঁচার আশা তো আছে!

দিনু এগিয়ে এসে বলে, তবু ওখানে দুবেলা খাবার পেতাম। পোশাক ছিলো। খাবার জল ছিলো। ছাই রেঙ্গুন! এতদিন ধরে শুধু এক জায়গায় চরকি পাক খাচ্ছি! এর জন্য এত কষ্ট করে জেল থেকে পালালাম? হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে দিনু রজক। ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার আসামি দিনু, সিপাহী বিদ্রোহের সুযোগে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা‌ চরিতার্থ করেছিল, যেমনটা বিপ্লব বিদ্রোহে প্রায়শই ঘটে থাকে।

ইসমাইল শান্ত স্বভাবের। সে দিনুর কাঁধ চাপড়ে উৎসাহ দেয়। বলে, তুমি রাজনাথ তোমরা তো রসে আসার কুড়ি দিনের মাথায় পালালে, তাই জানো না ওখানে আমাদের অতীত আর ভবিষ্যৎ কি ছিল! বর্তমান ছেড়েই দাও! আমি সবার আগে এসেছি। এমন দু-একজনকে চিনতাম যাদের বাবার মুখে রসের গল্প শুনেছে। সত্তর আশি বছর আগে রসে জেল বানাবার চেষ্টা করেছিল ব্লেয়ার সাহেব। পারেনি। ম্যালেরিয়ার মশার উৎপাতে। আমাদের দেশি কালা আদমিদের থেকে সাহেবদের ওরা বেশি পছন্দ করে! থিকথিকে মশা আর সাপের আখড়া ছিল। অবস্থা খুব যে পাল্টেছে তা তো নয়! সে তো কুড়ি দিনেই টের পেয়েছো তোমরা!

রাজনাথ ক্রুদ্ধ গলায় বলে, এসব রামায়ণ মহাভারত পরে শেখাবে। আমরা জানতে চাই কেন এভাবে আমাদের ঘুরিয়ে মারতে নিয়ে এলে? নিজেরাই পথ জানো না যখন! সর্দার চমন সিং বলে, এইসব জঙ্গলগুলোয় কাঁচা মাংস খাওয়া মানুষ গিজগিজ করছে। আমি শুনেছি। মশার কামড় তার চেয়ে ঢের ভালো ছিল।

আগা চুপ করে যায়। এতগুলো মানুষের সঙ্গে সেও মরতে চলেছে। যারা রেঙ্গুনের খোঁজ দিয়েছিল তাদের একজন এই দলে আছে। এখন তার নাম প্রকাশ করে দিলে অন্যরা ছিঁড়ে খাবে।

শেষ আশাটাও অন্তর্হিত হয়। অনন্ত পান্ডের নীরবতা, ইসমাইলের প্রসঙ্গান্তর, আগার উত্তর দানে অনীহা – এদের অবশেষে বুঝিয়ে দেয় যে পথ হারানো নয়, এই দ্বীপ রসের মতো আরেকটি দ্বীপ; খাড়ি দিয়ে আরও কতগুলি দ্বীপের সঙ্গে জড়িত মাত্র। জোয়ারে ও ঘন বৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন থাকে তারা। ভাটায় আবার যোগাযোগের পথ জেগে ওঠে।

পথ কোথাও পৌছবে না জেনেও ওরা হাঁটে। শুধু অলিখিতভাবে নেতৃত্ব বদল হয়। দ্বীপের ভিতর দিকে পাহাড়ি উচ্চতায় ওরা ঢুকতে থাকে ক্রমশ।

চমন সিং সিপাহী বিদ্রোহে অভিযুক্ত কয়েদী। সন্তান পরিবার নয়, দেশ মুক্ত করাই তার জীবনের স্বপ্ন। সে বলে, গোরাদের হঠাবার জন্য লড়াই করেছি।‌ অকারণে খুন করিনি। তাও এমন শাস্তি পাচ্ছি কেন গুরুর কাছে প্রশ্ন করি।

রাজনাথ প্রথমে, তারপর অনেকেই বলে রাতের অন্ধকার বাড়লেই তারা দুদিন হল ছায়ামূর্তির নড়াচড়া টের পাচ্ছে যেনো। ধড়মড় করে উঠে বসতে চোখ কচলায় রাজনাথ। কোথায় কি!

সর্দার চমন সিং ভেষজ চেনে। একরকম লম্বা পাতা, গাছগুলি মূলভূমিতে অজানা। রং সাদা, বড় বড় বাকল লেগে থাকে চামড়া ওঠার মতো। গাছের খসখসে পাতা থেঁতো করে লাগালে মশা দূরে থাকে তাই আপাতত রাতের ঘুমটা শান্তিতে হলো কিন্তু রাতে ছায়ামূর্তি দেখাটা কমলো না। অনেকেই ভূত-প্রেত মনে করে অস্থির হয়ে উঠল। রাজনাথ নিজেকে বোঝালো, এ বিভ্রম মস্তিষ্ক বিকৃতির পূর্ব লক্ষণ। ‌ চমন সিং তাকে সমর্থন করেছে। যদিও এসব যুক্তির কথায় কাজ হয় না। জিন আত্মা নেমে আসার ভয় আতঙ্ক তাড়া করে সবাইকে।

চমন সিং সিপাহী বিদ্রোহে অভিযুক্ত কয়েদী। সন্তান পরিবার নয়, দেশ মুক্ত করাই তার জীবনের স্বপ্ন। সে বলে, গোরাদের হঠাবার জন্য লড়াই করেছি।‌ অকারণে খুন করিনি। তাও এমন শাস্তি পাচ্ছি কেন গুরুর কাছে প্রশ্ন করি।
রাজনাথ বলে, কি উত্তর পাও?

চমন সিং গোঁফ মুচড়ে বলে, বাহে গুরু আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন।

রাজনাথ বলে, মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে সর্দার। মাথা সাফ না থাকলে এই অবস্থায় এমনি মরে যাব। কোনো পরীক্ষা দিতে হবে না।

সর্দার যশবীর সিংয়ের সঙ্গে রাজনাথের আলাপ জাহাজে আসার সময়। হাসিখুশি ছেলেটি কেমন ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে। চমন সিংয়ের সঙ্গেই সে বেশিক্ষণ সময় কাটায়। প্রৌঢ় চমন সিং তাকে সব সময় উৎসাহ দেয়। যশবীর হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে বলে, কিছুতেই কিছু হবে না। দেখো আমরা যত চেষ্টাই করি। ওই জাহাজে ওঠার সময় বুঝেছিলাম। খুব চেষ্টা করেছিলাম নিজের মনটাকে বাঁচিয়ে রাখার। আর পারছিনা।

চমন সিং ও চুপ করে থাকে। আশা খুঁজে পাওয়ার একমাত্র রাস্তা ঈশ্বর। কিন্তু ভয়ঙ্কর নিরাশার মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া আরো কঠিন! চমন সিংয়ের পাগড়িহীন মাথায় টাকের আভাস। পিছনের দিকে লম্বা রুক্ষ চুল গিঁট দিয়ে বাঁধা। সে মাথা নেড়ে বলে, বাহে গুরুজীর আদেশ, জঙ লড়তে হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। লড়তে গিয়ে শহীদ হলে তবেই আমাদের জিৎ।

রাজনাথ বলে, আগে নিজে বাঁচতে হবে। এই লড়াই গোরার বিরুদ্ধে নয়, পথ খুঁজে দেশে ফেরাও নয় এখন, স্রেফ বাঁচা!

মোট ছিল একশো তিরিশ। পথে খসে পড়া বাদ দিয়ে কেউ এখন গুনতিও করে না।

স্যাডহ্যামের বাংলায় আগুন লাগানোর জন্য তার গর্ব হয় কিন্তু অমন পরীর মতো মেয়েটা বাংলা ছেড়ে বেরোতে পারলো না বলে তার বেদনা জাগে। রাজনাথ তাকে উদ্ধার করতে পারলে ছাড়তো না! সে ভবানী বা তার মা যাই মনে করতো! মেয়েটার নীল তারার মতো চোখে তার জন্য ঘৃণার পরত ছিল, এই কালাপানির মতোই অতল ও সর্বনাশা!

তিলক সাধু বলে, মরার আগে মানুষ মৃত্যুকে দেখতে পায়। এমনকি নিজের মৃত ছায়াকেও রাজনাথ প্রাণপণে নিজেকে ঠেকায়। মরার আগে সে মরবে না কিছুতেই। মাঝরাতে সবাই হাত ক্লান্ত-অবসন্ন অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়লে, খাড়ির ধারে এসে বসে। চাঁদের আলোয় চকচক করে চারধার। খাড়ির গড়ানো ঢালের বালি, বিড়ালের চোখের মত জ্বলে।

সম্মুখে যেন রাজনাথের ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়ায়। যেন তার পিতৃপুরুষ। অন্ধকারে-মেশা বৃষস্কন্ধ, চওড়া চ্যাটালো শরীর। রাজনাথ বিন্দুমাত্র ভয় পায় না। স্বজনের সঙ্গে গল্প করার ভঙ্গিতে তার অবাধ্য সাদা গরু ও বাধ্য কালি গাই, বউ ভবানী, মা বাবা ঠাকুরদার কথা, স্যাডহ্যাম সাহেবের সাদা ঘোড়া আর সাদা মেয়েটার নীল চোখের মণির কথা বলে। স্যাডহ্যামের বাংলায় আগুন লাগানোর জন্য তার গর্ব হয় কিন্তু অমন পরীর মতো মেয়েটা বাংলা ছেড়ে বেরোতে পারলো না বলে তার বেদনা জাগে। রাজনাথ তাকে উদ্ধার করতে পারলে ছাড়তো না! সে ভবানী বা তার মা যাই মনে করতো! মেয়েটার নীল তারার মতো চোখে তার জন্য ঘৃণার পরত ছিল, এই কালাপানির মতোই অতল ও সর্বনাশা!

একসময় ছায়ামূর্তি সরে যায়। চাঁদ মেঘের আড়ালে। ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার আগে অবধি সেই অদৃশ্য ছায়ার সঙ্গে গল্প করে যায় সে।

চোদ্দ দিনের দিন। খাড়িগুলিতে জল ঢুকছে তীব্র স্রোতে। আগা রসের প্রথম লটের বন্দী। কালাপানির দুর্দম উচ্ছ্বাসও ধ্বংস ক্ষমতার সাক্ষী সে এবং আরো কজন। সতর্ক করে অন্যদের। নির্দেশ দেয় আরো ভিতরে ঢুকে যেতে। পরে আমরা জানবো এই বন্দীদশার সময় সমুদ্রতীর থেকে চার মাইল গভীরে ঢুকে গেছিল। অনেকদিন পর বুনো শুয়োর শিকার করা হয়েছিল। দু-এক টুকরো মাংস পেয়েছিল সবাই। এমনকি খেজুর গাছের বেঁটে কাণ্ড থেকে কিছু ফলও জোগাড় হয়েছিল। যশবীর খাওয়া দাওয়া কমিয়ে দিয়েছিল। সেদিন কয়েকটিমাত্র খেজুর খেয়ে জঙ্গলের ভেতর চলে গেল। ওরা ওসব নিজেরা এমন হতশ্রী আর অবসন্ন যে নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার আগে অব্দি কেউ যশবীরের খোঁজ করেনি। চিৎকার চেঁচামেচি করা যাবে না। তার মধ্যেই উত্তেজিত হয়ে কেউ একজন ওদের ডেকে নিয়ে গেল। একটা ঝোপালো আম গাছের মধ্যে নিজের সর্বশেষ ছিন্ন পোশাকটি গলায় মুড়িয়ে নগ্ন দেহে ঝুলে আছে যশবীর।

এই প্রথম সর্দার চমন সিংকে বাচ্চাদের মত হাঁটুতে মুখ গুঁজে, মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে দেখল রাজনাথ। শোকের বদলে ক্রোধে, আক্রোশে, হতাশায় রাজনাথ উন্মাদ হয়ে উঠল যেন।

সবাই গম্ভীর। যদিও তারা বুঝে গেছিল প্রার্থিত রেঙ্গুনে এবারে যাওয়া যাবেনা; তবুও শেষ আশা যদি একটা নিরাপদ জায়গা অন্তত পাওয়া যায়। যশবীরকে সমাহিত করে হাঁটা শুরু হলো ফের। পথে কখনো পরিত্যক্ত বাড়িঘর দেখতে পেলো। কোনমতে নারকেল পাতার ছাউনি, বাঁশের কাঠামোয় – ঘাড় এদিক-ওদিক হেলে পড়ে আছে। যদিও কোন মানুষের সাক্ষাৎ পায়নি কোথাও।

৫.
দুপুর হেলে এসেছে। খাঁড়ির ধারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গাছের তলায় বসে ছিল ওরা। নিঃশব্দে ছায়ামূর্তির মতো একদল পুরুষ যোদ্ধা তাদের ঘিরে ফেললো। একশো জনের বেশি দলটা এদের প্রথম দেখেছে বলে মনে হলো না! এমনকি আগা ও
ইসমাইল হেমন্তকে নেতা হিসেবেও চিহ্নিত করে নিল নিমেষে। আশেপাশের গাছপালা লতাগুল্ম অঝোর ধারায় চুবিয়ে বৃষ্টি নেমে এসেছে আবার। তীর ধনুকে সশস্ত্র, কালো গাছের মতো শক্তপোক্ত মানুষগুলির নিঃশব্দ ব্যুহ রচনায় রাজনাথরা বলির পাঁঠার মতো কাঁপতে লাগলো।

ঘন কোঁকড়া চুল তালুর সঙ্গে মেশানো। কারো মাথা কামানো। সামান্য পালকের আড়াল হাটুর নিচে পুঁতি ও পালক লতা দিয়ে বাঁধা।

নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল দ্রুত।

নিমেষে হত্যালীলা শুরু হল। ভাষা বোঝার কোন সম্ভাবনাই নেই কিন্তু দয়া ধর্মের যে চিরকালীন শারীরিক ভাষা থাকে তার পরোয়া করলো না এই দলটি।

রক্ত, কাদাজল, মৃত্যুভিক্ষা, আতঙ্ক, শরীর নির্গত বর্জ্য আর অমানুষিক কাতরানি, আর্তনাদ আঁশটে গন্ধে নরক হয়ে উঠলো সেই খাঁড়ির ঢাল ও সংলগ্ন জঙ্গল। রাজনাথ ছিল মাঝখানে। ফলে ওই কাটাকাটি ও তির যোজনার জন্য তার কাছে পৌঁছতে যে সময় লাগবে হিসেব মেপে তার সদ্ব্যবহার করল। জামাকাপড় খুলে ফেললো। হাতের কাছে গাছ লতাপাতা যা পেলো কোমরে পেঁচিয়ে নিলো কোনমতে।

এতদিনে তারপরে চলে যাওয়া রঙিন রক্ত কাদা মাটি মেখে নিল প্রাণপণে। শহিদুল বা শদুল তার দেখাদেখি পোশাক ছেড়ে নিলো। রাজনাথকে চুপিসারে বুকে হেঁটে পালাতে দেখে কুর্মি জগ্গু তার পাশে পেয়ে তাকে বাঁচাতে বলছিল। মুহূর্তমধ্যে একটা তির উড়ে এসে তার গলায় বিঁধে গেলো। কাটা পাঁঠার মত উল্টে গেলো জগ্গু।

রক্তমাখা কাদার ভেতর দিয়ে সতর্ক চিতার মত গুড়ি মেরে পাশ-ঘেঁষা দুর্ভেদ্য জঙ্গলে ঢুকে গেল রাজনাথ। একটা ঝোপালো আম গাছ দেখে উঠে পড়ল সে। উঠে দেখল আরো দুজন তারই মত নিজের ও অন্য কারুর রক্তে-ভাসা অবস্থায় কোনমতে ডাল আঁকড়ে হাঁফাচ্ছে।

গাছটা এবার টলমল করে উঠলো; নিচে থেকে আরো দুজন আহত গাছে ওঠার চেষ্টা করছে। গাছটা এত জনের ভার বহনে অক্ষম। মড়মড় চড়চড় শব্দে দুলতে থাকে সেটা। রাজনাথ দেখে হাত বাড়ালেই অন্য একটি গাছের শক্ত ডাল। সে দ্রুত লাফ দিয়ে সেই ডাল ধরে শরীর তুলে নেয় সেই গাছে।

মুহূর্তমধ্যে তীক্ষ্ণ শলাকার মতো কিছু এসে তার বাম ভুরুতে বেঁধে। এরপর কাঁধে আর ডান বাহুতে। রাজনাথ গাছ থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটতে থাকে। কিছু মাথায় থাকে না তার। শুধু তার সিপাহী শরীরের ব্যায়াম-পুষ্ট ক্ষিপ্র পা দুটি হাওয়ার বেগে ওঠে নামে।
ছোটা থামায় না। পিছনে দেখে না। যথাসম্ভব এঁকেবেঁকে দৌড়য়। শেষ শক্তিটুকু ফুরিয়ে গেলে পর সমুদ্রমুখী খাড়ির মোহনায় এসে কাটা কলাগাছের মত পড়ে যায়।
তেজারাম মুচি আর শহিদুল পাশে শুয়ে থাকে একইভাবে।

সেই রাতেও তীরের ফলার মতো তীক্ষ্ণ চাঁদ ওঠে আকাশে। শহিদুল তার ছেঁড়া জামা ছিঁড়ে রাজনাথের বাহুর ক্ষতে কষে বাঁধন দেয়। ভুরু আর কাঁধের তীর দৌড়নোর বেগে খসে পড়ে গেছে। ক্ষতস্থান টাটিয়ে উঠতে থাকে ততক্ষণে।
শহিদুল আর তেজারাম মুচির সঙ্গে দেশে থাকলে বামভন রাজনাথ তাদের ছায়াও মারাতো না। বংশ পরম্পরায় ভয়ও ভক্তিতে রাজনাথের এই দুর্দশায় তেজারামের চোখে জল আসে।

রাজনাথের গা জ্বরে পুড়ে যায়। সারা গা ক্ষতবিক্ষত। ভুল বকতে থাকে প্রায়। দেখতে পায় মাথার সামনে সাদা ও কালো গাই এসে দাঁড়িয়ে আছে। বালিকা বধূ ভবানীর শান্ত গোল রুটির মত মুখখানা যেন বড় কাছে।
রুটি দেখতেই সর্বগ্রাসী এক ক্ষিদে আসে তার। গোঙানির মধ্যে দিয়ে সে জিভ বাড়িয়ে নিজের হাত মুখের রক্ত চেটে খায়। কিছুক্ষণের মধ্যে বেহুশ হয়ে যায় তিনজনে।

রাজনাথ তিওয়ারি এবারে সামনের তরুণটির পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চায়, চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে প্রাণ ভিক্ষা করে। ক্যানোয় বসে থাকা লোকগুলির মধ্যে বয়স্ক একজন সম্ভবত দলটির অন্যতম নেতা। যে-তরুণটি রাজনাথকে মারবার জন্য তির যোজনা করেছিল তাকে জোর গলায় ডাকেন।

ভোর হয়েছে কি হয়নি, আদিবাসীদের ষাট জনের একটা দল ক্যানোয় চেপে ঘোরার সময় এদের আবিষ্কার করে। ওরা তিনজন তখন অর্ধ জাগ্রত। রাতের ঘুম খানিক শক্তি দিয়েছে। তিনজন কোনোমতে উঠে দাঁড়াতেই তীর চালায় দলটি। তেজারাম ও শহিদুলের বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় নিখুঁত লক্ষ্যভেদে। রাজনাথের নিতম্বে তির ঢুকে যায়। রক্তে ভেসে যাওয়া তেজা ও শহিদুলের শবের মধ্যে মড়ার ভান করে মুখ থুবড়ে পড়ে সে। চোখে নাকে মুখে রক্ত ঢুকে নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড়। কিন্তু ওদের চোখ এড়ানো সম্ভব হয় না। ‌এক তরুণ আদিবাসী তার পা ধরে টেনে হিঁচড়ে আনতে থাকে খাড়ির দিকে। জোরে হাসতে হাসতে নিতম্বের তির টেনে বার ক’রে। অসহ্য যন্ত্রণায় বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত রাজনাথ নিজের পশ্চাৎদেশ চেপে ধরে। দূরে থাকা আরেক ছেলে আবার তির যোজনা করে।

রাজনাথ তিওয়ারি এবারে সামনের তরুণটির পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চায়, চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে প্রাণ ভিক্ষা করে। ক্যানোয় বসে থাকা লোকগুলির মধ্যে বয়স্ক একজন সম্ভবত দলটির অন্যতম নেতা। যে-তরুণটি রাজনাথকে মারবার জন্য তির যোজনা করেছিল তাকে জোর গলায় ডাকেন। উচ্চকণ্ঠে কিছু নির্দেশ দেন। সামনে দাঁড়ানো ও তীর যোজনা করা তরুণ দুটি বোঝা যায় অনিচ্ছুক কিন্তু মুহূর্তমধ্যে নিজেদের ইচ্ছা ও ক্রোধ মুছে ফেলে। অন্যদের মধ্যে সামান্য দু’চারটে কথা চালাচালি হয়, কিন্তু প্রধানের কথার উপরে বেশি কথা চলে না। ক্ষতবিক্ষত মৃতপ্রায় উলঙ্গ রাজনাথকে চ্যাংদোলা করে ক্যানোয় এনে তোলে দুজন মিলে। এরপর আর কিছু মনে নেই রাজনাথের।

দ্বিতীয় ও শেষ পর্বের লিংক >> আবেরদিন শেষ পর্ব

Share Now শেয়ার করুন