সেবন্তী ঘোষ >> পিতৃহারা হলাম >> শঙ্খ ঘোষ স্মরণে >> গদ্য

0
614

পিতৃহারা হলাম

শান্তিনিকেতনে পড়ি তখন। শঙ্খ ঘোষ বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রভবনের প্রধান হয়ে এসেছেন। আশ্রমের নির্ধারিত সাহিত্যসভা ও নানা ঋতু বিষয়ক কর্মকাণ্ডের বাইরে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন শুনলাম।
এমন অনুষ্ঠানের মুখোমুখি একবারই হয়েছিলাম চীনা ভবনে। শম্ভু মিত্রের আগমনে। পুরনো আমলের শান্তিনিকেতনে বক্তা ও শ্রোতার মধ্যে খুব বেশি দূরত্ব থাকত না। উভয়ের মাঝে উচ্চ মঞ্চের আসন তৈরি করে শ্রোতাদের দূরে ঠেলে দেওয়া হতো না। শম্ভু মিত্রকে তাঁর সদ্য প্রকাশিত বই ‘ সন্মার্গ সপর্যা’ নিয়ে বয়সোচিত কায়দা দেখাতে গিয়ে একটি প্রশ্ন করে বেজায় বিড়ম্বিত হয়েছিলাম। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে কবি শঙ্খ ঘোষ আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে আমি একেবারে স্পিকটি নট! রবীন্দ্রভবনের সভায় শিশিরকুমার দাশ ও কেতকী কুশারী ডাইসনের রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ বিষয়ে যুযুধান তর্কের মুখোমুখি হয়ে শিহরিত হয়েছিলাম আমরা।
শঙ্খ ঘোষ নিজে প্রচ্ছন্ন থেকে তর্ক উস্কে দিচ্ছিলেন। মনে আছে, ‘অজাগর গরজে’ এখানে অজাগরের অনুবাদ স্নোরিঙ হবে কিনা, না, শব্দটা অজগর কিনা, তাই নিয়ে ভীষণ তর্ক  উঠেছিল। দেখছিলাম উত্তর-প্রত্যুত্তরের মাঝে মিষ্টি হাসি ছাড়া কবির মুখে কোনো অস্বস্তি ও বিরক্তি নেই।
পরে প্রকৃত অর্থে আলাপ হলো বিবাহসূত্রে। প্রিয় ছাত্রের বিয়েতে সাক্ষী হিসেবে সই করতে শিলিগুড়িতে আমাদের বাড়িতে এলেন। ধর্ম-না-মানা বর বিয়ে করছে স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টে। হিন্দু ধর্মের কোন রীতি সে মানে না। বিয়ে তাই রেজিস্ট্রিমাত্র। গোলবাধলো সিঁদুর পরানো নিয়ে। পাত্রীর মা কিছুতেই মানতে পারছে না এভাবে বিয়ে হতে পারে। পাত্রী দর্শকমাত্র! সিঁদুর পরানো নিয়ে যুযুধান শাশুড়ি ও জামাইয়ের মাঝে শঙ্খবাবু হাসছেন। শঙ্খবাবু ইঙ্গিতে ছাত্রকে বোধহয় সবার মানরক্ষায় একটু ছুঁয়ে দিতে বললেন। বিয়ের রেজিস্ট্রার কবিতা আবৃত্তি করেন। পাত্র-পাত্রীর দিকে তার কোন মন নেই! সামনে বসা শঙ্খ ঘোষকে দেখে তার হাতে ধরা কলম কেঁপে যাচ্ছে! পরে আমি ঠাট্টা করে স্যারকে বলতাম, আপনার সইতে বিয়ে হলো বলে হাজার চেষ্টা করেও বিয়েটা ভাঙতে পারলাম না !
সেই ১৯৯৩ থেকে যে-সম্পর্কের সূত্রপাত, ছিন্ন হল গতকাল ২০২১-এর একুশে এপ্রিল।এতগুলো বছর অজান্তেই কাদার তাল থেকে শিরদাঁড়া শক্ত করে দিলেন আমার। যে-আমি অন্যায় দেখলে বালিতে মুখ লুকানোর শিক্ষা পেয়েছি, সেই আমি সবসময় প্রতিবাদ করতে না পারলেও প্রশ্রয় দিই না আর তাকে। একদিন এক জনপ্রিয় কবি প্রশ্ন করেছিলেন ওর বাড়িতে গিয়ে কি পায় সেবন্তী? উনি তো কিছুই দেন না কাউকে! সম্ভবত সেই কবি জাগতিক পুরস্কার, যশের কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন। কী করে বোঝাই তাঁকে, যে একবার এই গুরুর দর্শন প্রকৃত অর্থে পেয়েছে, যশঃপ্রতিষ্ঠা সেখানে ‘শূকরী বিষ্ঠা’ মাত্র!
কবি ও প্রাবন্ধিক শঙ্খ ঘোষের মতো প্রকৃত অর্থে অসাম্প্রদায়িক, প্রচলিত ধর্মবোধহীন, মানবতাবাদী পণ্ডিত ও সাহসী মানুষ আমি জীবদ্দশায় দেখিনি। শঙ্খ বাবুকে কাছে থেকে দেখে বাদবাকি সবাইকে এমন স্বভাবে খর্বকায় মনে হতো যে, আমাদের রুচির ও আশার তার অনেক উঁচুতে বাঁধা হয়ে গেছিল। মনে মনে ওঁর পাশে রেখে বিচার করে ফেলাটাই দস্তুর হয়ে গেল আমাদের। হিমালয় যে দর্শন করেছে, টিলায় কি তার মন রোচে?
জীবনের ব্যক্তিগত বিপর্যয়ে পাশে থেকেছেন। তবে কাছের মানুষ বলে অতিরিক্ত সুযোগ পাই নি কখনো। সরকারি কবিতা উৎসবের সময়ে কমিটির প্রধান শঙ্খ ঘোষ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সেক্রেটারি জয়দেব। ফলে স্যরের নির্দেশে আমি বাদ। নব্বই দশকের আমার বন্ধুরা কবিতা পড়ছে, কিন্তু জয়দেবের অনুষ্ঠানে, স্যরের অনুষ্ঠানে আমি পড়লে, লোকে সেটাকে অন্যায় সুযোগ মনে করবে, এটাই ছিল ওঁর যুক্তি। তৃতীয় বছরে সুনীলদা ও বেলাল-দা এই বিচারে বেজায় আপত্তি তুলেছিলেন। আমি অন্তর্ভুক্ত হলাম।
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রভবনে গবেষকের পোস্টের বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে। এমন গবেষক চাইছে যে আগে কোনো গবেষণায় যুক্ত হয়নি। অবশ্যই অর্থমূল্যের ফেলোশিপ এটি। স্যার জানেন আমি এই পরীক্ষাটি দিতে যাচ্ছি। আমি জানি না যে উনি বিচারকমণ্ডলীতে আছেন! ঘরে ঢুকেই মাথায় বাজ পড়লো! স্বপন মজুমদার, শিশিরকুমার দাশ এবং স্বয়ং স্যর উপস্থিত। আমি তখন অন্য একটি গবেষণায় যুক্ত ছিলাম। ফলে স্যরের সামনে আর মিথ্যে কথা বলা গেলো না। ভয়ে তুতলে বিশেষ কিছু উত্তরও দিতে পারলাম না। স্বভাবতই কাজটা হলো না আমার।
অজস্র পুরস্কার পেয়েছেন। গ্রহণ করেছেন এবং বহু অর্থমূল্যের পুরস্কার দান করে দিয়েছেন। পুরস্কারের একটি টাকাও তাঁর বাড়িতে কখনও ঢোকেনি। কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেননি। একবার অধ্যাপকদের কম মাইনে নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্যর বললেন, আমার তো মনে হয় যথেষ্ট বেশি পাওয়া যাচ্ছে! এর চেয়ে আর কতো টাকা দরকার!
জাগতিক কোনো লোভের কাছে তাকে নুইয়ে দেওয়া যায়নি।
বই উৎসর্গ করেছেন। ‘মাটি খোঁড়া পুরনো করোটি’ । সব সময় আমার ছেলের খোঁজ রেখেছেন। ছেলের জন্মের পর শিলিগুড়ির বাড়িতে দেখতে এসেছেন। এই ফেব্রুয়ারি মাসের শেষেও ছেলের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নিলেন।
অনেকেই তার কন্যা সেমন্তী ঘোষের সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলতো। ঢাকা লিট ফেস্টে এক ভদ্রমহিলা আন্তরিকভাবে আমার লেখার প্রশংসা করার পর বললেন বাবা কেমন আছেন?
একবার সত্তর দশকের এক কবি স্যরের বাড়িতে রোববারে আমার লেখা কবিতার দুটি লাইন মুখস্থ করে এসেছেন। সম্ভবত স্যরকে খুশি করতেই! সামনে আমি বসে আছি। স্যর মৃদু হেসে শুনছেন। বাধা দিলেন না তাঁকে। সে যখন স্যারের কন্যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ , স্যর ইঙ্গিতে আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন যে, এর লেখা! ভদ্রলোকের মুখ তখন দেখার মতো! আমার নামে কোনো পত্রিকা দফতরের চেক ওঁর কাছে এসেছে, এমনও হয়েছে।
আরেকবার স্যরের বাড়িতে এক বিখ্যাত নাট্যকার অভিনেতার মুখোমুখি বসে আমি। স্যর সব সময় সবার সঙ্গে সবার আলাপ করাতেন। আমার সঙ্গে আলাপ করাবার পর ভদ্রলোক বললেন, আমি তো আপনার মেয়ের লেখা বলে এর দুটি বই কিনেছি! এবারে বিব্রত হওয়ার পালা স্যরের!
ফলে, সব অর্থেই আজ আমি দ্বিতীয় বার পিতৃহারা হলাম।

Share Now শেয়ার করুন