সেলিম জাহান >> অথ শিশু সমাচার >> চতুরঙ্গ

0
84

শিক্ষয়িত্রী তাদেরকে ভদ্রতা শেখাচ্ছেন। বলছেন, ‘You should be polite while addressing a stranger।’ একটি শিশু শব্দটি ঠিক ঠাহর করতে পারে নি। সে লিখলে,‘You should be polite while undressing a stranger’. বলুন দেখি, কী কাণ্ড!

নি-রবিবারের সকালের জলযোগটা বারান্দাতেই সারি। সব কিছু বারান্দার টেবিলটিতে সাজাই। খেতে খেতে রাস্তার দিকে তাকাই, রাস্তার ওপারের গাছটি দেখি, দৃষ্টি ছড়িয়ে দেই দূরের সুরম্য হর্ম্যরাজির দিকে। খাওয়া সেরে কফির পেয়ালা। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি অনেক শিশুকে নিয়ে হয় মা, নয় বাবা, অথবা মা-বাবা চলেছেন। তরুণ জনক-জননী এবং নানান বয়সের শিশু। কেউ শিশু-ঠেলুনি শকটে, কেউ মা-বাবার হাত ধরে। দেখি, মা-বাবা গল্প করছেন হাঁটতে-হাঁটতে, ঠেলছেন শিশু-শকট, আদর করছেন সন্তানদের।

একটা দৃশ্য বারে বারেই দেখি। মাঝে মাঝেই চোখে পড়ে; মা-বাবা ও শিশুর মধ্যে বেশ গুরুতর কোন কূটনৈতিক আলোচনা হচ্ছে – মনে হয় একটি অচল অবস্থা নিরসনের জন্যে। চলতে চলতে শিশুটি দাঁড়িয়ে গেছে। মুখ গোঁজ করে আছে – সে নড়বে না এক পা’ও আর। মা-বাবা প্রাণপনে বোঝাচ্ছেন হাত-পা নেড়ে – কখনও নরম করে, কখনও শক্ত করে। কিন্তু নট্নড়নচরণ নট্ কিচ্ছু। মনে হয় না যে, আরব-ইজরায়েল বৈঠকেও এতটা শক্তি ব্যয়িত হয়।

এ জাতীয় অবস্হার তিনটে ক্রমফল দেখেছি। এক, সব পক্ষই কথাবার্তার মাধ্যমে কোন একটা সমঝোতায় পৌঁছয়, যখন সকল অচলাবস্থার অবসান হয়। তারপর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রক্রিয়া মতো পরিবারটির পদযাত্রা পুনরায় শুরু হয়। দুই, হাল ছেড়ে দিয়ে মা-বাবা শিশুটিকে তার নিজের হাতে ছেড়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। শিশুটি কিছুক্ষণ অনড় থেকে পুরো পরিস্থিতিটি নিজের মনে পর্যালোচনা করে। তারপর একটা পর্যায়ে সে নিশ্চিত হয় যে, মা-বাবা আর ফিরছে না। তখন উপায়ন্তর না দেখে সে মা-বাবার দিকে দৌঁড়ুয়। তিন, মা-বাবা রেগে গিয়ে সকল সমঝোতার পন্থা বাদ দিয়ে শক্তির আশ্রয় নেন এবং জোর করে শিশুটিকে হিঁচড়ে সামনের দিকে চলতে থাকেন। শিশুটির গগনবিদারী চিৎকার তখন বধিরের কানেও পৌঁছে যায়।

শিশুদের আচরণ আমাকে চিরকালই অভিভূত করে। তাদের কথাও আমাকে মুগ্ধ করে। সেই যে আমার জ্যৈষ্ঠা কন্যা, যে তার শিশুকালে মাঠে-ঘাটে-বাটে সর্বদাই একটি কুড়িয়ে পাওয়া ডাল হাতে ধরে থাকতো। কিছুই করত না সে ওই ডালটির দ্বারা, শুধু রাজদণ্ডের মতো সে তা বহন করতো। একবার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিশু-ঠেলুনি শকটে উপবিষ্ট তার হাত থেকে তেমনি একটি ডাল কেমন করে যেন কোথায় পড়ে গেছিলো। খেয়াল হওয়ার পরেই সে কি কান্না তার। কাছেই পথে পড়ে থাকা আর একটি ডাল দেওয়া হল। কিন্তু ভবি ভুলিবার নয়। তখন প্রায় আধা মাইল পেছনে হেঁটে সেই বিশেষ ডালটি তার জন্যে খুঁজে আনতে হয়েছিল। আমি নিশ্চিত, যে-বর্তমানে একটা আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত এক সন্তানের জননী – আমার কন্যাটি – আজ একথা স্বীকার করবে না।

শেষে একটা স্বীকারোক্তি করি। শিশুরা তাদের কথা, লেখা, আচরণে আমাকে অভিভূত করলেও, তারা কিন্তু আমার দিকে খুব অবাক চোখে তাকায়। কেন যে এমনটা তারা করে, জানি না। তবে আমার মা একদিন বলেছিলেন যে, আমার মুখে নাকি বেশ বোকা বোকা একটা ভাব আছে আর শিশুরা নাকি বোকাদের অবাক হয়েই দেখে।

‘ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে, তোমারে করেছে রানী’ – সবার অতি চেনা গান। অনেকেই গেয়েছেন, তবে গানটি জনপ্রিয় হয়েছে জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে। তখন তার বয়স তিন কী চার, গানটি শুনে অভূতপূর্ব এক ব্যাখ্যা দিয়েছিল আমার কনিষ্ঠা কন্যা – ‘মেয়েটার জন্যে গিফট কিনতে কিনতে ছেলেটা ফকির হয়ে গেছে, আর মেয়েটা ছেলেটার কাছ থেকে গিফট পেয়ে পেয়ে বড়লোক হয়ে গেছে।’ তাঁর গানের এমন বাস্তব ব্যাখ্যায় গানের গীতিকার মূর্ছা যেতেন নিশ্চয়ই। শচীনদেব বর্মণের গানে ‘তুমি এসেছিলে পরশু, কাল কেনো আসনি?’ এ প্রশ্নে তার সাফ জওয়াব ছিল, ‘কাল বাস নষ্ট ছিল।’

তিনি এখন পাঁচের কাছাকাছি। আধো আধো বোল শুরু করার কালে আমার দৌহিত্রী আমাকে ‘কাগা’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করেন। ঠাট্টা করে আমিও তাকে উল্টো ‘কোজো’ বলে ডাকতাম। আমাকে ‘কাগা’ ডাকায় তার মা-বাবা বড়ই বিব্রত বোধ করত। দু’জনেই কন্যাকে সঠিক ডাকটি শেখানোর জন্যে উঠে পড়ে লাগতো। তারা যখন বলতো, ‘ন’ আকার ‘না’, ‘ন’ আকার না’, তখন আমার দৌহিত্রীও সঠিকভাবে বলতো, ‘ন’ আকার ‘না’, ‘ন’ আকার ‘না’। কিন্তু যে-মুহূর্তেই তার মা-বাবা বানান সমাপান্তে বলতো, ‘নানা’, সে-মুহূর্তেই প্যাভিলিয়নে ফিরে যাওয়ার মতো সে বলে উঠতো – ‘কাগা’। এখন অবশ্য সে সঠিক ডাকটি ডাকতে পারে। কিন্তু এখনো সে চশমাকে বলে ‘সুনতা’। এ শব্দের উৎস কোথায়, কে জানে!

আমাদের বাড়িতে বছর পাঁচেক আগে একটি শিশু তার মায়ের সাথে বেড়াতে এসেছিলো। আমি আমার পড়ার টেবিলে বসে কাজ করছিলাম। সে গুটিগুটি পায়ে আমার টেবিলের কাছে এসে আমাকে দেখছিল।আমি হাতের কাজ সরিয়ে তার সঙ্গে গপ্পো জুড়ে দিলাম। তার নাম জানতে চাইলাম, সে স্কুলে যায় কিনা জিজ্ঞেস করলাম। সে টুকটুক করে সব প্রশ্নের জবাব দিল। তারপর বললাম, ‘তোমার বয়স কত?’ সে সর্বাঙ্গীন গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললো, ‘পাঁচ’। তারপরই তার হয়তো মনে হল, আমি যেহেতু তার বয়স জিজ্ঞেস করেছি, আমার বয়স জিজ্ঞেস করাও তো তার ভদ্রতা। সুতরাং সে বেশ গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার বয়স কত?’ আমি ঠাট্টা করার জন্যে বললাম, ‘তিরিশ’। সে নির্বিকারভাবে তার অভিমত দিলো, ‘তা’ হলে তো তুমি বেশ বুড়ো।’

তাদের আচরণের মতো, কথার মতো, শিশুরা খুবই মজার মজার কথা লেখে। আমার কন্যাদ্বয়ের খুব কচি বয়সের কিছু লেখা আমর কাছে আছে (তার মধ্যে কবিতারও ছড়াছড়ি)। সেগুলো পড়ে চমকিত ও চমৎকৃত দুই’ই হই। বহুকাল আগে ‘Kids Sure Write Funny’ বলে একটি বই পড়েছিলাম। তার তিনটে উদাহরণের কথা মনে আছে।

একটি শিশু লিখেছিলো, ‘Dogma is the mother of dog’. Dog আর Ma-এর মধ্যে এই সম্পর্ক তার নিজের আবিষ্কার। আরেকটি শিশু লিখেছিলো, ‘We shouldn’t run around the classroom even when the teacher isn’t in the class. This is because even if she doesn’t see us, Jesus does and he might tell the Principal.’ যীশুখৃস্টকেই চুকলিখোর ভেবেছে শিশুটি। তবে তৃতীয় উদাহরণটিই সবচেয়ে মারাত্মক। শিক্ষয়িত্রী তাদেরকে ভদ্রতা শেখাচ্ছেন। বলছেন, ‘You should be polite while addressing a stranger।’ একটি শিশু শব্দটি ঠিক ঠাহর করতে পারে নি। সে লিখলে,‘You should be polite while undressing a stranger’. বলুন দেখি, কী কাণ্ড!

শেষে একটা স্বীকারোক্তি করি। শিশুরা তাদের কথা, লেখা, আচরণে আমাকে অভিভূত করলেও, তারা কিন্তু আমার দিকে খুব অবাক চোখে তাকায়। কেন যে এমনটা তারা করে, জানি না। তবে আমার মা একদিন বলেছিলেন যে, আমার মুখে নাকি বেশ বোকা বোকা একটা ভাব আছে আর শিশুরা নাকি বোকাদের অবাক হয়েই দেখে। এ আপ্ত বাক্যটি সত্যি হতেই হবে, কারণ প্রয়াত অদ্রীশ বর্ধনের মায়ের মতো, ‘আমার মা সব জানে।’

এই লেখকের তীরন্দাজ-এ প্রকাশিত অন্য লেখাগুলি পড়তে চাইলে ক্লিক করুন >> সেলিম জাহানের সব লেখা

Share Now শেয়ার করুন