সেলিম জাহান | অন্য এক শহিদের গল্প | চতুরঙ্গ | গদ্য

0
129

কত কৃতজ্ঞতা সেই সব মানুষের শহীদ আজিজের আত্মত্যাগের জন্যে। যখন সবকিছু আমি তাঁর মা’কে জানাচ্ছিলাম, তখন পুত্রের গর্বে গর্বিত মায়ের চাপা আভা আমি দেখছিলাম বৃদ্ধার চোখে-মুখে। বারবার তিনি শুনতে চাইছিলেন সেসব কথা – জানার ক্ষুধা যেন তার মিটছিলই না।

‘অতি যত্নের সঙ্গে, প্রভূত সম্মানের সঙ্গে এবং অনেক ভালোবাসায় মানুষটিকে আমরা এইখানেই সমাহিত করেছি। আপনাদের দেশের ছেলেটি আমাদের দেশের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত’, বলতে বলতে বৃদ্ধের গলা ধরে আসে। আমি সমাধির শ্বেতপাথরের ফলকের দিকে তাকাই। ঠাস বুনোনো লেখা, অনেক অক্ষরের কালো অংশ উঠে গেছে, তবু পড়া যায়।

বড় মমতার সঙ্গে সেখানে লেখা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর কর্পোরাল আবদুল আাজিজ কর্তব্যরত অবস্হায় ডিলি সমুদ্র-উপকূলে একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণে ২০০০ সালের ৩রা আগস্টে আত্মাহুতি দিয়েছেন। তাঁর জন্ম ঢাকায়। কর্পোরাল আবদুল আজিজের আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক।

শহিদ আবদুল আজিজের সমাধিফলক

আমার মনে পড়ে যায়, এবার কার্যোপলক্ষ্যে তিমোর-লেস্তেতে এসে বেশ ক’বার ডিলির সমুদ্রতটে গিয়েছি। আর সমুদ্রতটে যাবো কি! বসবাসই তো সমুদ্রতটে। সমুদ্রে নোঙর করা বিরাট এক জাহাজকে রূপান্তরিত করা হয়েছে হোটেলে। সেখানেই থাকি আমি।

গত ক’দিন বিকেলে সহকর্মী ও বন্ধুদের সঙ্গে ছোট ছোট ছাউনি দেয়া দোকানের সামনে বসে সমুদ্র থেকে সদ্যধৃত মাছের গরম ভাজা খেয়েছি। খেতে খেতে চোখ গেছে ঠিক ব্রাজিলের রিওর মতো অনতিদূরের পাহাডের মাথায় যীশুখ্রিস্টের শ্বেতমূর্তির দিকে – যার উল্লেখ সমাধিফলকে আছে।

সমাধির পাশে গ্রামবাসীদের লাগানো সাদা কফি ফুলের দিকে তাকাই। চকচকে পাতার কফিগাছে কী সুন্দর সাদা সাদা ফুল। মৃদু সুবাস ছড়াচ্ছে তারা। ফলকের কাছের বেগুনি বাগানবিলাস হাওয়ায় দুলে যেন প্রয়াত বাংলাদেশী তরুণটিকে আদর করছে। ডান দিকের বিরাট গাছটার মাথায় অচেনা এক পাখি ডেকে ওঠে। আমি সে পাখিকে খুঁজি। তারপর মুখ উঁচিয়ে নীল আকাশের দিকে চোখ মেলে রাখি। না, না, আকাশ দেখতে নয় – চোখের উদগত্ অশ্রু চাপতে। আবেগে আমার কণ্ঠ বুঁজে আসে।পাশে দাঁড়ানো আমার বন্ধু তিমোর-লেস্তে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি এলিজাবেথ সে আবেগ টের পায়। আস্তে করে সে আমার হাত ধরে।

এলিজাবেথই এই সমাধিস্হলে আমাকে নিয়ে এসেছে। পূর্ব তিমোরের রাজধানী ডিলি থেকে একটি প্রাদেশিক শহরের দিকে যাচ্ছিলাম। তখনই এলিজাবেথ আবদুল আজিজের গল্প বলে। সেটা ২০০৩ সাল। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত তিমোর-লেস্তে সরকারকে তাদের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় পরামর্শ দেয়ার জন্য জাতিসংঘ-বিশ্বব্যাংক যৌথ বিশেষজ্ঞ দলের দলনেতা হিসেবে ডিলিতে গিয়েছিলাম দু’সপ্তাহের জন্যে। ডিলি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত তখন। হোটেল বলতে কিছু নেই। থাকছিলাম সমুদ্রে এক জাহাজে। আমার ১৯৭২-এর বাংলাদেশকে মনে পড়ে যায়।

আমার মনে হলো তার দুটো কারণ আছে। এক, আমি পৃথিবীর যেখানেই যাই, একটুকরো বাংলাদেশ হৃদয়ে বয়ে বেড়াই। সে-টুকরোটি তিমোর-লেস্তের এক গণ্ডগ্রামে খুঁজে পেলাম। দুই, একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমি গর্বিত হলাম শহিদ আবদুল আজিজের বীরত্বগাথা শুনে।

আমাদের আশেপাশে তখন ভিড় জমে গেছে। শান্ত গ্রামটির নানা কোণ থেকে সাধারণ আবালবৃদ্ধ বনিতা এসেছে আমাদের আগমনের খবর পেয়ে। তিন বছর আগের এ ঘটনার কথা নানান জন বলছে নানানভাবে। আমি প্রয়াত আজিজের দেশের লোক জেনে কী তাঁদের কৃতজ্ঞতা, কত আপ্লুত তাঁরা! দু’একজন আমার হাত ধরল, ক’জন আমার গায়ে হাত রাখল, তাঁদের ভাষায় জানাল শহিদ আজিজের বীরত্ব গাথা।
এক বৃদ্ধা তো কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন। শহিদ আজিজের জন্যে নয়, তাঁর মায়ের জন্যে। ‘আহা, কোথায় এ ছেলেটির মা পড়ে আছে। মরণের সময়ে তাঁর মা তাঁর মুখে জলটুকু তুলে দিতে পারে নি’, আক্ষেপ করেন বৃদ্ধা। ‘কিন্তু আমরা তাঁর মুখে জল তুলে দিয়েছি’, এগিয়ে আসে এক কিশোরী। সাপের মতো মোটা দু’বেনীর আন্দোলন তুলে আশ্বস্ত করে সে আমাকে। তারপর বড় নরম গলায় বলে আমাকে, ‘যদি কোনদিন দেখা হয় তাঁর মায়ের সঙ্গে আপনার, বলবেন তাঁকে সুইমা তাঁর পুত্রের গলায় জল দিয়েছিল যখন সে পৃথিবী ছেড়ে যায়।’

সমাধিস্থলে লাগানো ফুল গাছ

আর সামলাতে পারি না নিজেকে। কপোলে উষ্ণ নোনাজলের ধারা টের পাই। এলিজাবেথ রুমাল এগিয়ে দেয়। মনে মনে ভাবি, এ কোন আবেগ আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল? দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে কেন অদেখা, অচেনা এক আবদুল আজিজের জন্যে আমার চোখে অশ্রু নামলো?

আমার মনে হলো তার দুটো কারণ আছে। এক, আমি পৃথিবীর যেখানেই যাই, একটুকরো বাংলাদেশ হৃদয়ে বয়ে বেড়াই। সে-টুকরোটি তিমোর-লেস্তের এক গণ্ডগ্রামে খুঁজে পেলাম। দুই, একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমি গর্বিত হলাম শহিদ আবদুল আজিজের বীরত্বগাথা শুনে। আমার অশ্রু তাই গর্বের অশ্রুও বটে।

অশ্রুসজল চিত্তে স্হানটি ত্যাগ করেছিলাম। ক’দিন পরে ডিলি। তার বছর খানেক বাদে দেশে এসেছি। একদিন ঢাকায় আমারই একসময়ের শিক্ষার্থী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চ পদস্হ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করছিলাম। কেমন করে যেন তিমোর-লেস্তের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্পোরাল শহীদ আবদুল আজিজের আত্মত্যাগের কথা উঠে এলো। কর্মকর্তাটি জানালেন যে, শহীদ আজিজের মা যশোর অঞ্চলে থাকেন।

শুনে আমার মনটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। মনে হল, সূদূর বিদেশে সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্যে নিঃস্বার্থভাবে জীবনদানকারী এই সেনানীর মাতা তাঁর তরুণ পুত্রের শেষশয্যা দেখেন নি, কোনদিনই হয়তো দেখবেন না। কিন্তু তাঁর হয়তো খুব সাধ ওই সমাধির পাশে গিয়ে বসতে, হাত বুলিয়ে দিতে। আরো ভাবলাম, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর এই সদস্য তো বৃহত্তর অর্থে আমারই সহকর্মী ছিলেন জাতিসংঘে। মনে হল, শহিদ আজিজের মায়ের সঙ্গে দেখা করাটা আমার পবিত্র কর্তব্য।

তার পরের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। নানান সরকারি কর্মকর্তার সহায়তায় একদিন যাত্রা শুরু হল প্রয়াত কর্পোরাল শহিদ আবদুল আজিজের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে। সঙ্গে থাকলেন স্হানীয় কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ঢাকায় জাতিসংঘের আমার সহকর্মীবৃন্দ। গ্রামে ওই বাড়িতে পৌঁছুলে দেখলাম গ্রামবাসীর ভিড়।

ঘরের ভেতরে শহিদ আজিজের মায়ের সামনে যখন পৌঁছুলাম, তখন বোঝা গেল যে তিনি চোখে ভালো দেখতে পান না। কিন্তু কী সাগ্রহে আমাকে কাছে টেনে নিলেন, জড়িয়ে ধরলেন – মা যেমন সন্তানকে করেন। বারবার আমার মুখে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন – যেন আমার মাঝ দিয়েই তিনি তাঁর পুত্রকে ছুঁচ্ছেন। আমার একমাত্র গুণ – আমি তাঁর পুত্র শহিদ আজিজের শেষশয্যা ছুঁয়ে এসেছি।

খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কত কথা যে জিজ্ঞেস করলেন। আমি সব বসলাম। শহিদ আজিজের সমাধির বর্ণনা দিলাম, তাঁকে বললাম, কী সম্মানে, কী পরম যত্নে, কী নিবিড় মমতায় তিমোর-লেস্ততের সূদূর এক গ্রামের লোকজন পরম আদরে তাঁর সন্তানটির জন্যে তাঁদের ভূমিতে শেষশয্যা রচনা করেছে। বললাম তাঁকে সুইমির কথা। না, তাঁর বীর পুত্র অনাদরে পৃথিবী ত্যাগ করেন নি। মায়া, মমতা, যত্ন আর আদর দিয়ে তাঁরা ভরিয়ে রেখেছিল শহিদ আজিজের শেষ মুহূর্তগুলো। কত কৃতজ্ঞতা সেই সব মানুষের শহীদ আজিজের আত্মত্যাগের জন্যে। যখন সবকিছু আমি তাঁর মা’কে জানাচ্ছিলাম, তখন পুত্রের গর্বে গর্বিত মায়ের চাপা আভা আমি দেখছিলাম বৃদ্ধার চোখে-মুখে। বারবার তিনি শুনতে চাইছিলেন সেসব কথা – জানার ক্ষুধা যেন তার মিটছিলই না।

কথাবার্তার এক পর্যায়ে তিনি উঠে গিয়ে অনেকটা হাতড়ে হাতড়েই আমার জন্যে একগ্লাসভর্তি খেজুরের রস নিয়ে এলেন। আমার হাতে সেটি তুলে দিতে দিতে বড় স্নেহময় কণ্ঠে বললেন, ‘খান বাবা। আমার আজিজ এডা খাতি বড়ই ভালবাইসতো।’ আমার চোখ ভরে জল এলো। একনিঃশ্বাসে শেষ করে গ্লাসটি তাঁর পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে মৃদুস্বরে বললাম, ‘আজ তবে আসি, মা।’ তিনি আমার মাথায় হাত রেখে খুব নরম করে বললেন, ‘আইজ আমার বড় আনন্দের দিন, বাবা।’

গাড়ীতে উঠতে উঠতে ভাবলাম, ‘আজ আমার বড় গর্বের দিন।’ জীবনে ভালো কাজ করার তালিকাটি খুব একটা দীর্ঘ নয়। কিন্তু কেন জানি মনে হলো, আজ বড় একটা ভালো কাজ করেছি। পালন করছি একটি মহতী দায়িত্বও। গর্বের জায়গাটি তো সেখানেই।

Share Now শেয়ার করুন