সেলিম জাহান >> ‘দেখিয়া শুনিয়া আনিও’ >> চতুরঙ্গ >> গদ্য

1
301

প্রতিটি ফর্দের নীচেই লেখা থাকত, ‘দেখিয়া-শুনিয়া আনিও।’ এও আমার কাছে রহস্যজনক বলে মনে হতো। কি দেখব আর কি শুনব? এ আবার কী ধরনের নির্দেশ। আমি কি পচা জিনিস কিনব – আমার বিচার-বুদ্ধি কি এতই খারাপ?

রোনা-কালেও তো বাজার-হাট করতে হয়। খেতে তো হবে। বাজার করতেই বেরিয়েছিলাম। সব নিরাপত্তা প্রক্রিয়া সুনিশ্চিত করে দোকানে ঢুকে বহুদিনের অভ্যাস বশত পকেটে হাত ঢুকিয়েই হেসে ফেললাম। ‘উঁহু’, মনে পড়ল, ‘আজকাল ওটা আর পকেটে থাকে না, কারণ ওটা আর কাগজ কিংবা লেখা-নির্ভর নয়। ওটার আবাসস্হল এখন মুঠোফোন।’ অন্য কিছু নয়, বাজারের ফর্দের কথা বলছি। কথাটা মনে পড়ল, কারণ শামীম মুখে মুখে বাজার-সামগ্রীর একটা তালিকা দিয়েছে। আগে হলে কাগজে টুকতাম, এখন তুলে নিয়েছি মুঠোফোনে। বাজারের ফর্দ ধরে ফর্দের বাজার করতে হবে।

প্রিয়জনের ফরমাশানুযায়ী বাজার করতে আমার খুব ভালো লাগে। একটা একটা করে জিনিস আমার হাতের ঝুড়িতে পুরতে থাকি, আর একটা একটা নাম সংশ্লিষ্ট হাতের তালিকা থেকে কাটতে থাকি – কিনি আর কাটি। ‘কেনা-কাটার’ চিত্রকল্প আর কি – ওই যে শিব্রাম চক্কোত্তি বলেছিলেন অনেক আগে, আমরা কিনি আর দোকানি আমাদের কাটে।

অনেকে আবার মোটেও বাজার-সওদা করতে চান না। বিমল করের লেখায় পড়েছি, লেখক প্রফুল্ল রায়ের হাতে তাঁর স্ত্রী বাদল রায় সকালে যখন বাজারের থলে ধরিয়ে দিতেন, তখন তিনি বাজার শেষে কখন ফিরে আসবেন, তা কারও জানা ছিল না। বাজার নিয়ে তিনি ফিরতেও পারেন, আবাব নাও ফিরতে পারেন, এমনই ছিল প্রফুল্ল রায়ের বাজার-অনীহা।

বাজার করায় আমার হাতেখড়ি বেশ ছোটবেলায় – আমার বয়স তখন ১১/১২ বছর হয়েছে কি হয় নি। আমার পিতা মনে করতেন, জীবনের বিরাট বড় শিক্ষা ওই বাজার করায়। বাজার তো একটি যুদ্ধক্ষেত্র – যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে প্রতিনিয়ত, টিঁকে থাকতে হবে প্রতিযাগিতায়, যেখানে কূটনীতি থেকে অর্থনীতি সব কিছুই শেখা যাবে। সেইসঙ্গে শেখা যাবে কি করে সব নোংরা জিনিসকে এড়িয়ে চলতে হয় – কারণ বাজারে কাদা, জল আর আবর্জনার ছড়াছড়ি। পৃথিবীর পথে পথে যে জ্ঞান ছড়িয়ে আছে, তা থেকেই আমাকে শিখতে হবে – এ বিশ্বাস থেকেই তিনি আমাকে বাজারের থলে ধরিয়ে দিলেন ষাটের দশকের একেবারে মুখের দিকে সম্পূর্ণ একা। ‘যাও বাবা, চরে খাও’ – এমন একটা মনোভাব নিয়েই বলা চলে।

বাজারের পয়সা নিতে হোত বাবার কাছ থেকে, আর বাজারের ফর্দ মা’র কাছ থেকে। ফর্দ দিয়েই শুরু করা যাক। আমার মা’ বহু সময় নিয়ে ফর্দ করতেন – শুধু যে কি কি কিনতে হবে, তা-ই নিয়ে ভাবনা করে নয়, লিখতেও তাঁর প্রচুর সময় লাগত। হাতের লেখা সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখতে চাইতেন। শুদ্ধ বানান সম্পর্কেও একধরনের নিবিষ্টতা ছিল। একমাত্র আমার মা’কেই দেখেছি বাজারের ফর্দ করার সময় অভিধান নিয়ে বসতেন।

তবুও ‘ভাঙনের শব্দ শোনা যেত।’ আমার মায়ের করা বাজারের ফর্দে ‘ঢেঁড়শ’ শব্দের ১১ রকম বানান দেখেছি। তিন রকমের ‘স’, দু’ রকমের ‘ড়’, চন্দ্রবিন্দুর অন্তর্ভুক্তি বা বর্জন – সম্ভাব্য সব রকমের বিন্যাস আমার মা’য়ের ‘ঢ়েঁড়শ’ শব্দে পেয়েছি। বাজারের ফর্দের জন্য সব রকমের সময় নষ্ট করার জন্য মা’র ওপর রেগে যেতাম। ভারি তর্ক জুড়তাম, বাজারের ফর্দ কি সাহিত্য নাকি যে ওটাকে সর্বাঙ্গ সুন্দর হতে হবে। ও’তে মার আচার-আচরণে কোনো বিকার হতো বলে মনে হয় না।

মা’র করা ফর্দে দু’টো জিনিষ সব সময়েই লক্ষ্য করতাম। এক, কোনো দ্রব্যসামগ্রীর পাশে হয়তো লিখতেন, ‘এক পোয়া’। তার পাশেই লেখা থাকত, ‘আধা সের আনিও না’। বুঝতাম না, এ বাক্যটির মাহাত্ম্য কি। বলাই তো হয়েছে কাঙ্খিত পরিমাণটি এক পোয়া (নিশ্চিত যে এ পরিমাপটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক গোলকধাঁধা)। তারপরে আবার ‘আধা সের আনিও না’ লেখার মানে কি? আমি কি যা বলা হয়, তার চেয়ে বেশি আনি? বিরক্ত হতাম যারপরনাই আমার ওপরে আস্হার অভাবে।

দুই, প্রতিটি ফর্দের নীচেই লেখা থাকত, ‘দেখিয়া-শুনিয়া আনিও।’ এও আমার কাছে রহস্যজনক বলে মনে হতো। কি দেখব আর কি শুনব? এ আবার কী ধরনের নির্দেশ। আমি কি পচা জিনিস কিনব – আমার বিচার-বুদ্ধি কি এতই খারাপ?

বাবার হাত থেকে নিতে হতো দু’টাকা। তারপর যেতাম নতুন বাজারে – যাওয়ার সময়ে হেঁটে যাও, ফেরো রিক্সায়, কারণ তখন হাতে ভারি বাজারের থলে থাকবে। তবে কোন অবস্হাতেই রিক্সা ভাড়া দু’আনার বেশি খরচ করা যাবে না। আবারও বেশ বড় চৌকো দু’আনি এ সময়ের বেশি লোকজন দেখেছে বলে মনে হয় না।

বাকি ১ টাকা ১৪ আনার মধ্যে পাঁচ সিকে দিয়ে মাছ বা মাংস কিনতে হবে। পাঁচ সিকে মানে কত, ক’জন বলতে পারবে? বাকি ১২ আনার মধ্যে ১ আনা দিয়ে কুঁচো চিংড়ি, ১ বা ২ আনা দিয়ে শাক, বাকি ১০ আনা দিয়ে হেসেখেলে বেশ ক’টি সবজি কেনা যেত। চিংড়ি মাছে, বেগুন বা ঢেঁড়শে ‘ফাউ’ দেয়ার চলন ছিল। কখনো কখনো কলাও কিনতাম – মর্তমান কলা, মোটা এবং ভেতরটা লালচে। আজকাল ওই কলা বিলুপ্তপ্রায়।

নতুন বাজারে হাতের বাঁ দিকে (বিএম কলেজের দিক থেকে এলে) খালের পাশেই বসতেন মাছ বিক্রেতারা – ছোট মাছ, বড় মাছ, জিওল মাছ নিয়ে। রাস্তা পেরিয়ে হাতের ডান দিকে বেশ ভেতর পর্যন্ত ছিল তরকারি ও ফল-ফলাদির বিক্রেতারা। এ দুটো ছাড়িয়ে দু’ পা এগোলেই মুন্সী সাহেবের চালের আড়ত। মুন্সী সাহেবের ভ্রাতৃ-কন্যা হাসিনা আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক ছিলেন। মুন্সী সাহেবের দোকানের উল্টো দিকেই ছিল নতুন বাজার ডাকঘর।

আরেকটু সামনে গিয়ে হাতের ডানে রুটির দোকান – কী মিষ্টি গন্ধ যে পাওয়া যেত সেখানে – ঠিক ঢাকায় তেজগাঁও শিল্পঅঞ্চলে নাবিস্কোর সামনে দিয়ে গেলে বুকভরে শ্বাস টেনে যে-সুবাস ভেতরে টেনে নিতাম। সেটা ছাড়িয়ে হাতের বাঁ দিকে ছিল সুরেশদা’র চুল ছাঁটার দোকান। স্কুল-কলেজে পড়ার সময়ে সুরেশদা’র খদ্দের ছিলাম আমি বহুদিন। তারপরই নতুন বাজারের শেষ – বামে ছিল নতুন বাজার পুলিশ ফাঁড়ি। তার উল্টো দিকেই বেরিয়ে গেছে বগুড়া রোড।

এসব ভাবতে ভাবতেই দেখি যে দোকানে বাজারের ফর্দ মিলিয়ে জিনিস কিনতে হবে, সেখানে পৌঁছে গেছি। মনে হল, বাজার করে যখন সব জিনিস নিয়ে যাব সেই অতি প্রিয়জনের কাছে, তখন অনুযোগ প্রচুর শুনতে হবে। বলা হবে, যা আনতে বলা হয়েছে, তার বেশ কিছু ভুলে গেছি বা উল্টোপাল্টা করেছি, শুনতে হবে, ঠিক পরিমান আনিনি কিছু কিছু জিনিসের, জানানো হবে যে ভালো জিনিস আনতে পারিনি, ঠকিয়েছে আমাকে দোকানিরা। যা আনতে বলা হয়নি, অর্থাৎ ফর্দে নেই, তাও এনে উপস্হিত হয়েছি।

এর কোনটাতেই আমি মন দেব না, কারণ আমি তো জানি, যার ফর্দ ধরে আমি বাজার করেছি, সে জানে তার চাওয়ার মূল্য কতখানি আমার কাছে, আর তাই কতখানি চেষ্টা আমি করেছি তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসগুলো নিয়ে আসার জন্য। এটাও তো জানি যে, ফর্দের বাইরের যে-জিনিসটি এনেছি, সে-জিনিসটি তার প্রিয় বলেই এনেছি। তাই সব অনুযোগের পরেও একসময়ে বোধের এই আলো জ্বলে উঠবে তার মুখে – যে-আলো দেখতাম আমার মায়ের চোখে, যখন বাজারের থলেটি উপুড় করে তিনি ভেতরের জিনিসগুলোকে মাটিতে ছড়িয়ে দিতেন। বলতে দ্বিধা নেই, ‘দেখিয়া শুনিয়া আনিও’ কথাটির মানে বেলায় বুঝি নি, অবেলায় বোধহয় বুঝতে পারি।

Share Now শেয়ার করুন

1 COMMENT