সেলিম জাহান >> ‘দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক’>> চতুরঙ্গ >> গদ্য

0
277

বাংলাদেশকে চিহ্নিত করতে হয় তার মানুষের উদ্যমের দ্বারা, তাদের সাহসের দ্বারা, তাদের সৃষ্টিশীলতা আর কর্মকুশলতার দ্বারা, তাদের সক্ষমতার দ্বারা। বাইরের বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে চেনায় যে-বাঙালিরা, বাইরে আছেন তাঁরা। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে চিহ্নিত হতে হবে তার নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতার দ্বারা, স্বপ্নের দ্বারা, বিশ্ববীক্ষণের দ্বারা।

যে কোন কাজ করতে গেলেই পটভূমিতে আমার সঙ্গীত লাগে – তা সে গানই হোক আর বাজনাই হোক। স্বদেশী-বিদেশী, লোকজ-আধুনিক, কোনটাতেই আমার অসুবিধে নেই। কিন্তু পেছনে একটা কিছু ‘বাজতে হবে’ কিংবা ‘চলতে হবে’ – এই যেমন বাজনা ‘বাজতে হবে’ কিংবা গান ‘চলতে হবে’। গান বা বাজনা আপন পথে এগোয় আর আমার কাজও চলতে থাকে। এই অভ্যেসটা গড়ে উঠেছিল কৈশোরে অঙ্ক কষতে বসে। সেই অভ্যেসটা রয়ে গেছে এখনো, সুবাস যেমন ভেসে বেড়ায় বাতাসে মৃদুভাবে।

সেই মতো গান ছেড়ে দিয়ে লিখতে বসেছিলাম। লোপামুদ্রা মিত্রের গান – আমার খুব প্রিয় শিল্পী। লিখতে লিখতে টের পাই, পরিচিত গানগুলো শিল্পী গেয়ে ফেলেছেন – এই যেমন, ‘মালতী বালিকা বিদ্যালয়’ কিংবা ‘সাঁকো’ অথবা ‘দু’বোনের গল্প’। শুনতে থাকি, তিনি পেরিয়ে যাচ্ছেন ‘যে যায়, সে যায়’ কিংবা ‘তর্কে মাতো, তর্কে মাতো’ অথবা ‘এ ঘর যখন ছোট্ট ছিলো’। গানগুলোর কথা, সুর আর শিল্পীর গায়কী আচ্ছন্ন করে রাখে আমাকে।

তারপর লোপামুদ্রা গাইতে শুরু করেন ‘ঠিক যেখানে দিনের শুরু, অন্ধকালো রাত্রি শেষ’। নাহ্, এটা শুনি নি আগে, মনে মনে নিজকে বলি আমি। তাই কথাগুলো জানা নয়, তবে সুরটা ভারী ভালো লাগে। বেশ জোরালো গলায় গাইছেন লেপামুদ্রা। কিন্তু অন্তরায় এসে কান খাড়া হয়ে যায় আমার – ‘এই কাঁটাতার, জঙ্গি বিমান, এই পতাকা রাষ্ট্র নয়’, দেশ মানে বুক আকাশ জোড়া ইচ্ছে হাজার সূর্যোদয়।’ কিন্তু তারপরেই সারা গায়ে আমার কাঁটা দিয়ে ওঠে যখন লোপামুদ্রা গেয়ে ওঠেন, ‘এ মানচিত্র জ্বলছে জ্বলুক, এ দাবানল পোড়াক চোখ, আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক’।

আমার চারপাশ যেন বিলুপ্ত হয়ে গেলো। আমার লেখা বন্ধ হয়ে যায়, আমি কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। আমি চোখের সামনে যেন দেখতে পাই ‘একাত্তরের বাংলাদেশ’। জ্বলছে সারা দেশ শত্রুর দেয়া আগুনে। ছারখার হয়ে যাচ্ছে গ্রাম-জনপদ। মরছে মানুষ শত্রুর হাতে, অনাহারে, বুভুক্ষায়। জ্বলছে দেশ আর তার মানুষ।পুড়ছে মানচিত্র। তবু ওই তো সারা জায়গায় লোকের পাশে লোক দাঁড়িয়ে – যুদ্ধক্ষেত্রে এক মুক্তিযোদ্ধার পাশে আরেক জন, যশোর রোডের দীর্ঘ সারিতে এক শরণার্থীর পাশে আরেকজন, গ্রামে-গ্রামে এক গ্রামবাসীর পাশে শহর থেকে পালিয়ে আসা এক শহরবাসী। সেখানে ধর্ম বড় নয়, ধন-সম্পদ বড় নয়, গ্রাম-শহর বড় নয়, সেখানে মানুষ বড়। আবেগে আমার চোখ ভরে জল এলো, ইতিহাস কথা ক’য়ে উঠল আমার মনে, আর লোপামুদ্রা তখনও গেয়ে চলেছেন, ‘আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক’।

চূড়ান্ত বিচারে একটি দেশ হচ্ছে তার মানুষ – তার জনগণ। মানুষ দিয়েই তো দেশ চিনি আমরা।

ওই কথাটাই ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে’ কথা কয় আমার করোটিতে। আমি ভাবি, আসলেই তো দেশ মানে তো শুধু একটা ভূখণ্ড নয়, শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, শুধু একটি নাম নয়, শুধু একটি পতাকা নয়, শুধু একটি সংবিধান নয়, শুধু একটি জাতীয় সঙ্গীত নয়। ওগুলো একটি দেশের স্বাধীনতার প্রতীকী নিদর্শন। ওই সব নিদর্শন দিয়ে দিয়ে আমরা একটা দেশকে অন্য দেশ থেকে আলাদা করি, কিন্তু ওগুলো দেশ নয়। চূড়ান্ত বিচারে একটি দেশ হচ্ছে তার মানুষ – তার জনগণ। মানুষ দিয়েই তো দেশ চিনি আমরা।

একটি দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী, মানসিকতা, কর্মের দ্বারাই একটি দেশ চিহ্নিত হয়। আমরা জানি যে ক্যামবোডিয়া খুব গর্বিত একটি দেশ, কারণ দরিদ্র হলেও সে-দেশটির মানুষের আত্মসম্মানবোধ বড় প্রখর। যদিও ইটালির সবাই নিশ্চয়ই ঠগবাজ নয়, কিন্তু তার অনেক মানুষের ফন্দি-ফিকিরের কারণেই আমরা বলি যে, ‘ইতালি চোর-চোট্টার দেশ’। ইংরেজদের ব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের প্রায়শই মন্তব্য, ‘ইংল্যান্ড হচ্ছে শীতল মানসিকতার দেশ’। মানুষই তো দেশ চেনায়।

এই যেমন, বাংলাদেশেকে শুধু নদী-নালার দেশ বলি, তা’হলে তার স্বাতন্ত্র্য তেমন করে বেরিয়ে আসে না। অমন ডজন খানেক নদী-নালার দেশের নাম এক নিঃশ্বাসে বলে দেয়া যাবে। বাংলাদেশকে যদি শুধু দরিদ্র দেশ বলি, তা’হলে তার অর্জনকে খাটো করে দেখা হবে এবং তার সম্ভাবনাকেও উপেক্ষা করা হবে। বাংলাদেশকে চিহ্নিত করতে হয় তার মানুষের উদ্যমের দ্বারা, তাদের সাহসের দ্বারা, তাদের সৃষ্টিশীলতা আর কর্মকুশলতার দ্বারা, তাদের সক্ষমতার দ্বারা। বাইরের বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে চেনায় যে-বাঙালিরা বাইরে আছেন তাঁরা। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে চিহ্নিত হতে হবে তার নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতার দ্বারা, স্বপ্নের দ্বারা, বিশ্ববীক্ষণের দ্বারা।

কথায় কথায় আমরা প্রায়শই বলি, দেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশ নষ্ট হয় না, নষ্ট হয়ে যায় দেশের মানুষ। যখন দেশের মানুষ নষ্ট হয়ে যায়, তখনই নষ্ট হয়ে যায় দেশ, সমাজ, জাতি।

মানুষ শুধু দেশই চেনায় না, মানুষ মানুষের সঙ্গে থেকে বিন্দু থেকে যে সিন্ধু গড়ে তোলে, সেটাই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ধন-সম্পদ নয়, পাহাড়-নদী নয়, ইমারত-অট্টালিকা নয়, চূড়ান্ত বিচারে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সৌহার্দ্য, মানুষে-মানুষে সখ্য, মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধনই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। ধর্মের কথা বলে, জাতের কথা বলে, আমরা যখন মানুষে মানুষে বিভাজনের দেয়ালটা তৈরি করি, তখন ওই মানবিক বন্ধনটা নষ্ট হয়ে যায়। ওটা নষ্ট হয়ে গেলে দেশ গড়া যায় না। তখন হয়তো ইমারত গড়ে ওঠে, সেতু গড়ে ওঠে, শিল্প গড়ে ওঠে, কিন্তু দেশ গড়ে ওঠে না। খণ্ডিত, বিভাজিত জনগোষ্ঠী সমাজকে, জাতিকে, দেশকে দুর্বল করে দেয়। কথায় কথায় আমরা প্রায়শই বলি, দেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশ নষ্ট হয় না, নষ্ট হয়ে যায় দেশের মানুষ। যখন দেশের মানুষ নষ্ট হয়ে যায়, তখনই নষ্ট হয়ে যায় দেশ, সমাজ, জাতি।

যেহেতু, সমষ্টিগত মানুষই হচ্ছে দেশের প্রাণ, তাই মানুষই হচ্ছে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। উন্নয়ন মানে শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, শুধু মাথাপিছু আয়ের বাড়তি নয়, শুধু শিল্পায়ন নয়। উন্নয়ন মানে হচ্ছে সব মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো, তাদের সুযোগের সৃষ্টি, সমতা নিশ্চিতকরণ, তাদের সক্ষমতা ও সু্যোগের ক্ষেত্রে, তাদের চয়নের ক্ষেত্রটির বিস্তার। উন্নয়ন হচ্ছে সব মানুষের সমঅধিকার, সব মানুষের নিরাপত্তা, সব মানুষের অংশগ্রহণ ও কথা বলার অধিকার। উন্নয়ন হচ্ছে কার্যকর গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, সমতা। উন্নয়ন হচ্ছে মানুষের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিতকরণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা, পরমত সহিষ্ণুতা। চূড়ান্ত বিচারে, উন্নয়ন হচ্ছে মানুষের উন্নয়ন, মানুষের জন্যে উন্নয়ন, মানুষের দ্বারা উন্নয়ন। সেই মানব উন্নয়নেরই তো আকাঙ্ক্ষা আমাদের, আশা করি উত্তরণের, স্বপ্ন দেখি পরিবর্তনের। বলি মৌসুমী ভৌমিকের মতো, ‘স্বপ্ন দেখবো বলে, দু’চোখ পেতেছি’।

আমরা যেন হতাশাগ্রস্ত হয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে না থাকি। শুধুমাত্র ‘সমালোচনার সংস্কৃতি’তেই নিজেদের আবদ্ধ না রাখি। আসলে চূড়ান্ত বিচারে, নিরাশার কোনো ইতিবাচক দিক নেই।

জানি, এ আকাঙ্ক্ষা একদিনে পূর্ণ হবে না। আমার জীবনকালেও হয়তো হবে না। তবু অনাগত ভবিষ্যতে একদিন হবে। এও জানি, আমাদের বা তার পরের প্রজন্ম দিয়ে এ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হবে না। আমরা নষ্ট হয়ে গেছি। কিন্তু যারা শিশু-কিশোর, যারা এখনো নষ্ট হয় নি, তারা নিশ্চয়ই এটা পারবে। আমাদের কোনো শিক্ষা হয়নি, কিন্তু তাদের যদি এখনই সঠিক মূল্যবোধ দিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত করা হয়, তারা ঠিকটাই শিখবে। জয় গোস্বামীর মতো বলি, ‘বোন, তোকে বলি, এ অস্হি পোড়াবো না, গাছের কোটরে রেখে যাবো এই হাড়, আমরা শিখিনি, পরে যারা আছে তারা, তারা শিখবে না এর ঠিক ব্যবহার’? এই কাজটিই আমাদের প্রজন্মের মানুষদের করতে হবে। আমরা যেন হতাশাগ্রস্ত হয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে না থাকি। শুধুমাত্র ‘সমালোচনার সংস্কৃতি’তেই নিজেদের আবদ্ধ না রাখি। আসলে চূড়ান্ত বিচারে, নিরাশার কোনো ইতিবাচক দিক নেই।

কোন এক স্বপ্নের ঘোরে কেমন যেন আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ সংবিৎ ফিরে পেলাম। শুনি আর টের পাই ততক্ষণে লোপামুদ্রা গানের শেষ কলি দু’টো তে চলে গিয়েছেন। গাইছেন দরাজ গলায়, ‘সব মানুষের স্বপ্ন তোমার চোখের তারায় সত্যিই হোক, আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক’।