সেলিম জাহান >> রাতের শহর >> চতুরঙ্গ >> গদ্য

0
366

রাতের শহর

একা হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে আমি থেমে পড়ি – পেছনের পদধ্বনিও মিলিয়ে যায়। কিন্তু হৃদয়ে সে ধ্বনি নিত্য বাজে – নিরন্তর সে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’।

রাতের শহর ঘোরা আর দেখা আমার ভারী ভালো লাগে – তা সে গা ছমছম করা ভুতুড়ে শহরই হোক, অথবা সন্ধের পরে মরে যাওয়া শহরই হোক, কিংবা সারা রাত জেগে থাকা টগবগে শহরই হোক। রাতের শহর দেখার এই নেশা আমাকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন প্রয়াত তাজুল ভাই (পরবর্তীকালের শ্রমিক নেতা কমরেড তাজুল ইসলাম, যাঁকে ১৯৮৪ সালের ১লা মার্চ আদমজি পাটকল এলাকায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল)।

সলিমুল্লাহ ছাত্রাবাসের ৩৩ নম্বর কক্ষের সহকক্ষবাসী ছিলাম আমরা। চারজনের সে-কক্ষের আমার পাশেই ছিল তাঁর আবাস। সারাদিন লাইব্রেরিতে কাটিয়ে আমি ফিরতাম সন্ধ্যার দিকে। দলের অফিসের কাজ শেষ করে তিনি আসতেন রাত ৯টা নাগাদ। তারপর রাতের খাওয়া সেরে ১০টার দিকে এইবার বেরিয়ে পড়া – ‘চলো মুসাফির’। আমরা হাঁটতাম নানান রাস্তায়, পদচারণার ক্ষেত্র ছিল বিস্তৃত, বিধিবদ্ধ কোন নিয়মও ছিল না।

সলিমুল্লাহ ছাত্রাবাসের সামনের বিশালকায় শিরিষ গাছে গাছে ছাওয়া পথটা পেরিয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্হাপত্য বিভাগের বাড়িটিকে বাঁয়ে রেখে চলে যেতাম পলাশি ব্যারাকের পথের পাশে ছক্কু মিয়ার দোকানে। সেখানে চা খেতে খেতে শুনতাম চা খেতে আসা রিক্সা যাঁরা চালান তাঁদের আলাপ। নানান কথা বলতেন তাঁরা – নিত্যযাপিত জীবনের কষ্টের কথা তো থাকতো ই, সেই সঙ্গে থাকতো তাঁদের ফেলে আসা গ্রামের গল্প। কী অদ্ভূত মমতায় এক চিত্রকল্প তৈরির মাঝ দিয়ে তাঁরা গল্প ফাঁদতেন যে ঘোর লেগে যেতো আমার। মাঝে মাঝে কথা উঠত নদীর ভাঙনের কথা, ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। তখন কেমন একটা অব্যক্ত আর্তিতে ঘন হয়ে উঠতো চারপাশ, অদ্ভূত এক নিস্তব্ধতা নেমে আসতো যে বাতাসও ভারি হয়ে উঠতো।

মাঝে মাঝে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম পুরোনো ফুলবাড়িয়া স্টেশনের দিকে। দেখতাম ভাসমান মানুষদের জীবন। ফুটপাতে সার-বেঁধে একজনের পর আরেকজন ঘুমিয়ে আছেন। ওই তাঁদের আশ্রয়। বালিশ নেই, বিছানা নেই, তবু এক অদ্ভূত শয্যা রচিত হয়েছে খোলা আকাশের নীচে। পাশের শায়িত মানুষটিকে হয়তো চেনেন না, জানেন না, তবু ঘুমুতে এসে তাঁরা যেন এক হয়ে যান। সাম্যের অমন দৃশ্য বড় একটা দেখা যায় না অন্য কোথাও।

একবার হেঁটে হেঁটে চলে গিয়েছিলাম সদর ঘাট তক। দেখি অত রাতেও শ্রমজীবী মানুষের কোন কর্মবিরতি নেই। গম গম করছিল চারদিক তাঁদের কথায়, পদশব্দে। লঞ্চ আর জাহাজ থেকে মাল নামানো হচ্ছে, দুদ্দাড় করে সেগুলোকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল গুদামে, ধাঁ ধাঁ আলো জ্বালিয়ে রাস্তার পাশে বড় বড় ডেকচিতে রান্না হচ্ছিল ভাত, মুরগির মাংস আর ডাল। উবু হয়ে বসে এনামেলের থালা থেকে গোগ্রাসে খাচ্ছিলেন ক’জন মানুষ। চেনা জগত, মানুষের প্রতি মমতা, জীবনের বহু শিক্ষা তো সেই নানান পথের হাঁটা থেকেই কুড়োনো।

ভালবাসা যে পাত্রে রাখা হয়, তারই আকার ধারণ করে। ভালবাসা যেমন প্রাসাদে থাকতে পারে, তেমনি থাকতে পারে কুঁড়েঘরেও। ভালবাসার জন্যে হর্মরাজির প্রয়োজন হয় না, সেটা ফুটপাতেও গড়ে নেয়া যায় – চাই শুধু ভালবাসার মনটা।

রাতের শহর দেখার সেই নিরন্তর হাঁটার ছেদ পড়ে নি এখনো। পৃথিবীর যে শহরেই যাই – কার্যোপলক্ষে বা নেহাত বেড়াতে – রাতের খাবার পরেই বেরিয়ে পড়ি। পথ যেদিকে টানে, সেদিকেই চলি। কত কিছু যে দেখেছি এ রাস্তায়, সে রাস্তায়; এ-বাঁকে, সে-বাঁকে; এ-মানুষে, সে-মানুষে।

কারাকাসের পথে হাঁটতে গিয়ে চোখে পড়েছে ভালবাসার এক সুনন্দ ছবি। ফুটপাতেই সংসার তাদের। তরুণ বরের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে তরুণী বউটি – ছেলেটি মেয়েটির মাথার মেঘের মতো চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন পরম মমতায়। পাশে বসে খেলছে তাদের বছর দু’য়েকের শিশুটি। মৃদু স্বরে গল্প করতে করতে একসময় হঠাৎ জোরে হেসে উঠতেই শিশুটি চমকাল ভীষণভাবে। মা তাকে কাছে টেনে জডিয়ে ধরলেন।

ভালবাসা যে পাত্রে রাখা হয়, তারই আকার ধারণ করে। ভালবাসা যেমন প্রাসাদে থাকতে পারে, তেমনি থাকতে পারে কুঁড়েঘরেও। ভালবাসার জন্যে হর্মরাজির প্রয়োজন হয় না, সেটা ফুটপাতেও গড়ে নেয়া যায় – চাই শুধু ভালবাসার মনটা।

প্রচণ্ড বর্ষা হচ্ছে। ছাতাতেও মানছে না। রাতও হয়েছে বেশ। কিন্তু প্রায় চলে এসেছি কিয়েভে আমার হোটেলের কাছে – মোড় ঘুরলেই পৌঁছে যাব। সামনে তাকিয়ে দেখি, উল্টো দিক থেকে আসছে মা আর তিনটি বাচ্চা। সবচেয়ে ছোটটিকে মা বুকের কাপডের তলায় জড়িয়ে নিয়েছেন। এক হাত দিয়ে পাশে জড়িয়ে ধরেছেন তাঁর কিশোরী কন্যাটিকে, যে-কিনা আগলে আছে তার ছোট ভাইটিকে। মা’টি তার লম্বা চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন এ দুটো সন্তানের মস্তক – নিজে তিনি ভিজে জবজব, সোনালি চুল থেকে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা – মুখ জলস্নাত। ভাবলাম, মায়ের এ-ভালবাসা সার্বজনীন – একমাত্র মা’রাই এমনটি করতে পারে।

সরু সড়কের এপার থেকেও চোখে পড়ে মেয়েটির নীরব অঝোর ধারার কান্না। জলে ভেসে যাওয়া মুখ তুলে সে তাকিয়ে আছে ছেলেটির মুখের দিকে, যে-মুখ অন্যদিকে ঘোরানো। এ ভঙ্গিতো সনাতন সর্বদেশে, সর্বকালে।

আমার মনে হল, আর কিছুক্ষণ পরেই আমি ফিরে যাব পাঁচতারা হেটেলের উষ্ণতায়। কিন্তু এরা? এ-মা আর তাঁর তিনটি সন্তান কোথায় যাবেন? আমার কাছাকাছি আসতেই আমি আমার ছাতাটা মায়ের হাতে ধরিয়েই দিলাম দৌঁড়। সেটা কি বৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচাতে নাকি অন্য কিছুর তাড়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে, তা আজও জানি না।

ছেলেটি-মেয়েটি দু’জনেই ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে তাদের নিজ নিজ সাইকেলের হাতল ধরে। মেয়েটির সাইকেলটি উত্তরে মুখ করা, ছেলেটিরটি দক্ষিণে। মেয়েটির পরনে ভিয়েতনামী মেয়েদের লম্বা ঝুলের জামা আর ঢোলা পাজামা – ছেলেটির পাশ্চাত্য পোশাক।

সরু সড়কের এপার থেকেও চোখে পড়ে মেয়েটির নীরব অঝোর ধারার কান্না। জলে ভেসে যাওয়া মুখ তুলে সে তাকিয়ে আছে ছেলেটির মুখের দিকে, যে-মুখ অন্যদিকে ঘোরানো। এ ভঙ্গিতো সনাতন সর্বদেশে, সর্বকালে। হয় ছেলেটি বলেছে যে সে আর মেয়েটিকে ভালোবাসে না, অথবা কোন কারণ না দেখিয়েই সে বিচ্ছেদ ঘটাতে চায়। মেয়েটি কিছুই বুঝতে পারছে না, আর ওই মুহূর্তে ক্রন্দনের ভাষা ভিন্ন আর কোন ভাষা তো তার জানা নেই।

রাস্তার এপাড় থেকে আমি তাদের দেখছি। কি হবে এখন? ছেলেটি কি মেয়েটির দিকে তাকাবে, হাসবে, মেয়েটির কাঁধে হাত রাখবে? তারপর তার সাইকেলের মুখ ঘুরবে আর দুটো সাইকেলই একদিকে যাবে ধীরলয়ে, মৃদু কণ্ঠে দু’জনে ভালবাসার কথা বলতে বলতে? নাকি দুটো সাইকেল দু’দিকে চলে যাবে – মেয়েটার জন্য অপেক্ষা করে আছে একটি অশ্রুঝরার বিনিদ্র রাত? আর ছেলেটির জন্য কে বা কি অপেক্ষা করে আছে – জানা তো নেই।

বার্সেলোনার এক রেস্তোঁরায় স্পেনীয় এক জিপসি গায়িকা দাবি করে বসেছিলেন যে, আমি তাঁর বহুকাল আগের হারিয়ে যাওয়া ভাই। তাঁর দাবির স্বপক্ষে একটিমাত্র যুক্তিই তিনি উপস্হাপন করেন – তাঁর আর আমার গাত্রবর্ণ এক।

রাতের ঘোরাঘুরিতে কখনো-সখনো বড় বিব্রতকর অবস্হাতেও তো পড়েছি। একবার আমস্টার্ডামের রাস্তায় এক মাতাল ধরেছিল আমাকে। কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিল সে যে তাঁকে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। যত বলি যে আমি তাঁকে চিনি না, কোথায় তাঁর বাড়ি, তাও জানি না, ততই তিনি বলছিলেন যে, তাঁর স্ত্রী অত্যন্ত দজ্জাল মহিলা – দশটার মধ্যে বাড়ি না পৌঁছুলে তাঁকে ঘরে ঢুকতে দেয়া হবে না, খাবার তো দূরের কথা। নাহ্, তাঁকে সাহায্য করতে পারি নি সে-রাতে।

বার্সেলোনার এক রেস্তোঁরায় স্পেনীয় এক জিপসি গায়িকা দাবি করে বসেছিলেন যে, আমি তাঁর বহুকাল আগের হারিয়ে যাওয়া ভাই। তাঁর দাবির স্বপক্ষে একটিমাত্র যুক্তিই তিনি উপস্হাপন করেন – তাঁর আর আমার গাত্রবর্ণ এক। আমার হাতের পাশে হাত ঠেকিয়ে তিনি তাঁর দাবির পক্ষে প্রমাণ রাখেন। তিনি নিশ্চিত যে, বহুকাল আগে ভারতীয় জিপসিরা আমাকে চুরি করে নিয়ে যায়। ভাগ্যক্রমে আজ তিনি আমায় খুঁজে পেয়েছেন। যত আমি তাঁর ভগ্নীত্বের কথা অস্বীকার করি, তত তিনি অভিমান করে বলেন যে, আজ আমি বড়লোক বলে, শিক্ষিত বলে দরিদ্র ও শিক্ষাহীন ভগিনীকে অস্বীকার করছি। সেদিন আমার সহকর্মীরা এ-বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার না করলে যে কি হতো, তা কেবল আমার ঈশ্বরই জানেন।

‘এইসব দিনরাত্রির’ রাত্রিতে যখনই শহর থেকে শহরের রাস্তায় হাঁটি, তখনই আমার পায়ের শব্দের পেছনে আরেকটি পদধ্বনি শুনি। আমি জানি এ পদধ্বনি কার। এ পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে একদিন নানান পথে আমি হেঁটেছি। একা হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে আমি থেমে পড়ি – পেছনের পদধ্বনিও মিলিয়ে যায়। কিন্তু হৃদয়ে সে ধ্বনি নিত্য বাজে – নিরন্তর সে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’।

Share Now শেয়ার করুন