সেলিম জাহান | হাস্নাহেনার পরশের হাসনাত ভাই | চতুরঙ্গ | নিয়মিত গদ্য

0
52

জন্ম : ১৭ জুলাই ১৯৪৫ | মৃত্যু : ১ নভেম্বর ২০২০

আমার লেখালেখির এক মুখ্য উদ্দীপক ছি লেন হাসনাত ভাই – আমার সম্পাদক আবুল হাসনাত। তিনিই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন। ওই তাঁর এক বিরাট গুণ। তিনি লেখক তৈরি করতে পারতেন – অনেকটা সন্তোষকুমার ঘোষ বা বিমল করের মতো।

প্রয়াণের খবরটি প্রথম দিয়েছিল শামীমই (কবি শামীম আজাদ) – বেশ সন্তর্পণেই। সেও তো এক বছর হয়ে গেলো। কারণ প্রয়াত মানুষটির সঙ্গে আমার নৈকট্য ও ঘনিষ্টতার কথা সে জানে। শামীমের কথাগুলো কেমন যেন ইথারে ভর করে কেটে কেটে আমার হৃদয়ে পৌঁছুল – ‘নেই…. নেই… হাসনাত ভাই… আর… নেই’। এই শব্দগুচ্ছ আমার মাথায় এক বায়বীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল – কেমন এক ভোঁতা ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল আমার সারা চেতনায়। আমি দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলাম জানালা পেরিয়ে রাস্তার ওপারের সবুজ পাতার গাছের মাথায় আর সময় যেন ঘুরতে লাগলো পেছনে আরো পেছনে।

ষাটের শেষের দিকে মাহমুদ আল জামান নামটি জানা হয়ে গেল। তাঁর কবিতা পড়ি হেথায়-হোথায়, ভালো লাগে। জানলাম যে, তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম পুরোধা। ১৯৬৯ সালে ঢাকায় এলে মুখোমুখি পরিচয় হল। পরিচয় করিয়ে দিলেন সংস্কৃতি সংসদের তদানীন্তন সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ ভাই (বর্তমানের The Daily Star-এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম)। জানলাম মাহমুদ আল জামান তাঁর ছদ্মনাম – তাঁর আসল নাম – ‘আবুল হাসনাত’।সেই থেকে তিনি হয়ে গেলেন আমার ‘হাসনাত ভাই’।

ছবি সংগৃহীত

তারপর দেখা হয় মাঝে মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের এখানে ওখানে – মধুর ক্যান্টিনে, শরীফ মিয়ার দোকানে। টুকটাক কথা, কুশল বিনিময়, সৌজন্যমূলক কথা – আমাদের আলাপচারিতা ওটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো। সম্পর্কের গাঢ়তা তখনও জমেনি।

তারপর সেখানে সাময়িক ছেদ পড়ল ১৯৭৭ সালে যখন আমি উচ্চশিক্ষার জন্যে বিদেশ চলে যাই। মধ্য-আশির দশকে বিদেশ থেকে ফিরে এসে ঢাকায় ব্যস্ত ছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও নানান উপদেষ্টা-পরামর্শকের কাজ নিয়ে। সেই সঙ্গে মেতে ছিলাম টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র ও অন্যান্য অনুষ্ঠান নিয়ে। আড্ডারও কমতি ছিল না। একদিন তদানীন্তন জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনীর (আমার বইয়ের প্রকাশক) কর্ণধার মফিদুল হকের দপ্তরে আবার নতুন করে দেখা দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদক আবুল হাসনাতের সঙ্গে – ‘হাসনাত তাইয়ের সঙ্গে।

হাসনাত ভাই বললেন, ‘সামনেই বাইশে শ্রাবণ। সাময়িকীর বিশেষ সংখ্যা বেরুবে। রবীন্দ্রনাথের ওপর একটা লেখা দিন না।’ ভাগ্যক্রমে তখন ‘রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি-চিন্তা’ বলে একটা বড়সড় গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখছিলাম। সেখান থেকে একটা অংশ নিয়ে লিখে ফেললাম ‘রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন চিন্তা’। বিশেষ সংখ্যায় পূর্ণ পাতা জুড়ে বেরুল সে লেখা। তারপর কিছুদিন পর পরই সাময়িকীতে লেখা দিতে থাকলাম – তবে মূলতঃ সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি বিষয়ে। পরে অবশ্য কবি মোহাম্মদ রফিকের উৎসাহ অনুপ্রেরণায় সাহিত্য বিষয়েও ঢুকে পড়লাম। জাতীয় কবিতা উৎসবের পরে রফিক ভাইয়ের প্ররোচনায় লিখলাম ‘কবিতার ভবিষ্যত’। সেই প্রথম চারকোলের কাজ করা শিরোনাম অলঙ্করণে সাহিত্য সাময়িকীর প্রথম পাতায় বেরুল সে লেখা।

কিছুদিন পরে হাসনাত ভাই বললেন, ‘একটা কলাম লিখতে শুরু করুন না’। জনান্তিকে শুনেছি, হাসনাত ভাইয়ের সহকর্মী সন্তোষ দা’ (প্রয়াত সন্তোষ গুপ্ত) হাসনাত ভাইকে বলেছিলেন, ‘ওকে দিয়ে কলাম লেখান। কলমের জোর আছে।’ কলামের নাম ঠিক করলাম, ‘কড়ি-কড়চা’। তারপর দীর্ঘ পাঁচ বছর ওটা লিখেছি। প্রতি মাসের এক পক্ষে লিখতেন মনজুর ভাই (সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম) সাহিত্য বিষয়্ক কলাম ‘অলস দিনের হাওয়া’, অন্য পক্ষে বেরুতো আমার সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতি বিষয়ক কলাম ‘কড়ি-কড়চা’।

ক’দিন পরেই বুঝলাম, নিয়মের কি গ্যাঁড়াকলে আটকা পড়েছি আমি। মাঝে মাঝেই লেখা দিতে দেরি আমার। আমার মজ্জাগত আলসেমিই আমাকে গ্রাস করে। সময় মতো লেখা না দিয়ে হাসনাত ভাইকে অনেক সময়েই বিপদে ফেলেছি। কিন্তু কখনো তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় নি কেমন করে তিনি সামাল দিয়েছেন। একবার অবশ্য সন্তোষদা’র (সন্তোষ গুপ্তের) পরামর্শে আমাকে আহমেদুল কবীর সাহেবের কক্ষে আটকে রেখে ‘এক কাপ চা ধরাইয়া দিয়া’ (সন্তোষদা’র ভাষায়) লেখা আদায় করা হয়েছিলো।

কখনো কখনো তাঁর টেবিলের সামনে বসেই নিউজপ্রিন্ট টেনে লিখতাম। সামনে থাকতো ধূমায়িত চা। মাঝে মাঝে সম্পাদকের আসন ছেড়ে বজলু ভাই আমাদের কাছে চলে আসতেন। যোগ দিতেন পাশের টেবিল থেকে সন্তোষদা’। আড্ডা জমে উঠতো। বিএম কলেজে আমার পিতার শিক্ষার্থী ছিলেন বলে আমার প্রতি তাঁর এক বিশেষ স্নেহ ছিল। মনে আছে, বহু বছর বাদে নিউইয়র্ক থেকে দেশে গেলে তিনি প্রয়াত ড. স্বদেশ বোস, নূরজাহান আপা (আমার পিতার আরেক শিক্ষার্থী নূরজাহান বোস) ও আমাকে এক সন্ধ্যায় ঢাকা ক্লাবে আপ্যায়ন করেছিলেন।

এরশাদ আমলে দু’বার সঙ্কট এসে উপস্হিত হলো। ‘কড়ি-কড়চার’ জন্যে একবার লিখলাম ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক অর্থনীতি’ – রীতিমত উস্কানিমূলক এক লেখা। বজলু ভাই ছাপতে একটু দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু হাসনাত ভাই নানান যুক্তি দেখিয়ে ছেপে দিলেন। বিরাট ঝুঁকি নিয়েছিলেন তিনি সন্দেহ নেই, কিন্তু পেছপা হন নি।

দ্বিতীয়বার ঘটল আরও চরম সংকট। সংবাদের কোন এক সংখ্যার জন্যে হাসনাত ভাই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিলেন ‘স্বৈরাচারের স্বরূপ’। এরশাদের উল্লেখ নেই, কিন্তু যে কেউই পড়লেই বুঝবে যে, এটা এরশাদ উদ্দেশ্য করেই লেখা। এবার বিষয়টি আর সম্পাদক পর্যায়েও থাকলো না – পত্রিকার মালিক প্রয়াত আহমেদুল কবীরের কাছে গেলো নিষ্পত্তির জন্যে। তিনি এককথায় এর নিষ্পত্তি করে দিলেন – ‘এ লেখা ছাপা হবে। এর জন্যে যদি আমার পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়, বন্ধ হোক’। প্রয়াত শিল্পী কামরুল হাসানের সেই বিখ্যাত ‘বিশ্ব বেহায়ার’ নামাবলী চাপিয়ে লেখা বেরিয়েছিল। আপোষহীনতার খেসারত দিতে হয়েছিল আমাদের সবাইকে।

আমার লেখালেখির এক মুখ্য উদ্দীপক ছিলেন হাসনাত ভাই – আমার সম্পাদক আবুল হাসনাত। তিনিই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন। ওই তাঁর এক বিরাট গুণ। তিনি লেখক তৈরি করতে পারতেন – অনেকটা সন্তোষকুমার ঘোষ বা বিমল করের মতো। আমাদের ঘনিষ্ঠতা ও সখ্যের শুরু ওই লেখালেখি থেকেই। প্রায়শই আড্ডা দিতে যেতাম মফিদ ভাইয়ের দপ্তরে বা হাসনাত ভাইয়ের কক্ষে। বহুদিন আমরা তিনজন কাছের বাংলা খাবারের দোকান ‘কস্তুরীতে’ দুপুরের খাবার খেতে যেতাম।

বেনুর সঙ্গে কথা বলতেন নানান বই নিয়ে। পহেলা বৈশাখে বা বইমেলায় রোদেলা মেখলাকে আদর করতেন। মিনু আপার (তাঁর স্ত্রী নাসিমুন আরা হক) ছোট ছোট লেখা আমার ভালো লাগতো। একবার তাঁর লেখা পড়েই জেনেছিলাম যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের একতলায় মধুর ক্যান্টিনের দিকে সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দ্রের দেয়াল-ঘেঁষা বহু পুরোনো ত্রিভঙ্গ মুরারী গাছটি হচ্ছে অশোক ফুলের। সে গাছে পরবর্তী সময়ে লাল লাল অশোকগুচ্ছ দেখেছি।

হাসনাত ভাই ‘কালি ও কলমে’ চলে যাওয়ার পরে বহুবার বলেছেন লিখতে। সময় করতে পারিনি। এ নিয়ে তাঁর একটি অনুযোগও ছিল। ক’বছর আগে নিউইয়র্কে দিঠির বাড়িতে বেড়াতে এলে বহুক্ষণ গল্প করেছিলাম ফোনে। সামনা সামনি তিনি আমার লেখার প্রশংসা করেননি। সম্পাদকের নির্মোহ ব্যবহারে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। কিন্তু লোকের কাছে তিনি আমার লেখার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁরই পরামর্শে মফিদ ভাই আমার ‘কড়ি-কড়চার’ লেখা কুড়িয়ে বাড়িয়ে চার-চারটি বই প্রকাশ করেছেন।

গতবছর যখন ঢাকায় কথা হয়, তখন আমার কাছেই আমার লেখার ভীষণ প্রশংসা করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, সমাজ-রাষ্ট্র-অর্থনীতির মতো খটোমটো বিষয়ে অমন সোজা করে ঝরঝরে গদ্যে আর কোন লেখকের দেখা পাননি তিনি। আমার লেখালেখির ক্ষেত্রে অমন বড় প্রশস্তি আমাকে আপ্লুত করেছিল – বিশেষত: আবুল হাসনাতের মতো সম্পাদকের কাছ থেকে। তিনি বলেছিলেন, আমার বহু লেখার আবেদন সার্বজনীন এবং সে সব লেখা নিয়ে ‘বেঙ্গল’ থেকে একটি বই বার করতে ভীষণভাবে চেয়েছিলেন তিনি। হয়নি তা এবং হবেও না তা আর।

বড় ভালো মানুষ ছিলেন হাসনাত ভাই – ভদ্র সজ্জন, বিশাল মনের মানুষ। তিনি ছিলেন নিভৃতচারী, মৃদুভাষী ও আত্মপ্রচারবিমুখ। তাঁর চুল, চেহারা ও সোনালি গোলাকৃতি চশমায় তাঁকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো লাগতো আমার। বিশেষ করে আমাকে আকর্ষণ করতো তাঁর চোখের তীব্র ঔজ্জ্বল্য। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর চেহারায়, চরিত্রে ও ব্যবহারে হাস্নাহেনার মতো একটি কোমল পরশ ছিল – যে পরশের স্নিগ্ধতায় সিক্ত হয়েছে আমার জীবনও।

Share Now শেয়ার করুন