সৈয়দ আকরম হোসেনের জন্মদিন >> প্রকাশিত হলো তাঁর লেখা কবিতা ও সোহানুজ্জামানের গদ্য

0
2194

সৈয়দ আকরম হোসেনের কবিতা ও সোহানুজ্জামানের শ্রদ্ধার্ঘ্য >> জন্মদিন

সম্পাদকীয় নোট : আজ লেখক-গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষক সৈয়দ আকরম হোসেনের জন্মদিন। শুধু শিক্ষকতা বা লেখালেখি নয়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর বাংলা পঠনপাঠনকেও আধুনিক করে তোলার কাজে কখনও নেপথ্যে থেকে, কখনও সরাসরি অবদান রেখেছেন। তাঁর পঠনপাঠন ও গবেষণা-পরামর্শ পেয়ে বাংলাদেশে আজ অনেকেই নানাভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তিনি যে একসময় কবিতা-গল্প লিখতেন, এমনকি উপন্যাস লিখেছেন বলে তাঁর সরাসরি ছাত্র থাকা কালে তাঁর মুখ থেকেই শুনেছি। এখানে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে দুটি লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। একটি সৈয়দ আকরম হোসেনের লেখা কবিতা অন্যটি তাঁর ছাত্র সোহানুজ্জামানের লেখা একটি গদ্য। সৈয়দ আকরম হোসেন যে শুধু শিক্ষক-গবেষক ছিলেন না, লিখেছেন কবিতার মতো সৃষ্টিশীল লেখা, তার কিছুটা পরিচয় মিলবে এখানে প্রকাশিত ষাটের দশকের বিখ্যাত সাহিত্য সাময়িকী ‘পরিক্রম’-এ প্রকাশিত তাঁর কবিতাটি পড়লে। তীরন্দাজের পক্ষ থেকে তাঁকে জন্মদিনের শুভকামনা জানাই। 

মাসুদুজ্জামান, সম্পাদক, তীরন্দাজ। 

কবিতা >>

সৈয়দ আকরম হোসেন >> গ্লোব, প্রজাপতি ও একটি উজ্জ্বল মুখ

কোন একটি প্রশ্ন সকালে নয়, যখন দুপুরে নির্জন ট্রেনের চাকা
গড়িয়ে উধাও সিলিমপুর মাঠে আর অনেক যাত্রীর মন
ঠুংঠাং চুড়ির মতন কাঁপে;
কিংবা বিকেলের অতি ব্যস্ত শহরের মোড়ে
একটি চশমার ফ্রেম একটি হৃদয়ে যখন ছড়ায় স্মৃতির ঘ্রাণ
সেই মুহূর্তেও নয়
অথচ নামলো বৃষ্টি নিঃসঙ্গ রত্রির প্রহরে, রাস্তার বিচ্ছিন্ন ধুলায়
ঝোপে-ঝাড়ে, মল্লিকার সতেজ পাতায়
বারান্দার পুতুলের গায়ে, উঠানের গোলাপি সারিতে, ও বাড়ির
কার্নিশ, কাঁচের শার্সিতে, জানালার সবুজ পর্দায় আর
যে তরুণীটির একটি শুভ্র হাত গড়িয়ে হয়েছে নির্জীব
জানালার একটু এপার
সেখানেও ঝরছে বৃষ্টি–বৃষ্টি ঝরছে।

আমার কক্ষের পুরানো টেবিলে একটি ধূসর গ্লোব
যেন একটি উজ্জ্বল মুখ (যে মুখ ঘুম ভেঙে অতি দ্রুত
দিয়েছে জানালা
কিংবা আধো খোলা জানালার ফাঁকে দেখছে বৃষ্টির জল, এমনই বৃষ্টি)
একটি রঙিন প্রজাপতি বহুক্ষণ উড়ছিল ঘরের আকাশে
সময়কে হারিয়ে ফেলে বৃষ্টির জলে
বসল আদৃত গ্লোবের শরীরে।
একটি টিকটিকি নেমে এল সুচতুর ভঙ্গিতে
কুয়াশাঘন হলুদ দুচোখ, গ্রীবায় রক্তের দাগ, এবং
একটি বিমর্ষ স্ফুর্তির ধ্বনি কেটে নিল
কেড়ে নিল কাছে গচ্ছিত প্রজাপতির রঙিন বয়স।
দেখলে দেখা যেতে পারে গ্লোবের শরীরে লেগে আছে
প্রজাপতির ডানার সুরঙ
একটু উজ্জ্বল তাকে করে রেখে গেছে।
এই মুহূর্তে মনে হল গ্লোব গ্লোব নয় যেন,
মিসিসিপি, মিশৌরি, হোয়াংহো, নীল-দানিউব আর
নায়াগ্রা প্রপাতের
যত জল আছে
অশান্ত উচ্ছ্বাসে রক্তের স্রোত হয়ে গেছে
রক্তের স্রোত হয়ে গেছে টেবিলের ধূসর গ্লোব।

আমার টেবিলে একটি রক্তিম গ্লোব
যেন একটি উজ্জ্বল মুখ
যে মুখ ঘুম ভেঙে অতি দ্রুত দিয়েছে জানালা
কিংবা আধো খোলা জানলার ফাঁকে দেখছে বৃষ্টির জল
এমনই বৃষ্টি।

পরিক্রম, সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও রফিকুল ইসলাম, তৃতীয় বর্ষ, ৯ম সংখ্যা, ভাদ্র ১৩৭১। সেপ্টেম্বর ১৯৬৪।

সৈয়দ আকরম হোসেনকে নিয়ে সোহানুজ্জামানের গদ্য >>

 ‘কে আর বাজাতে পারে পাখি তোমার মতো?’

শিরোনামের উদ্ধৃতিটি আমি নিয়েছি আহমদ ছফার একটা কবিতা থেকে। হ্যাঁ, এই কবিতার যে মর্মবাণী সেই ভাষাতেই প্রিয় শিক্ষক সৈয়দ আকরম হোসেনকে নিয়ে আমার এই সামান্য-কথন। কবিতা-বোদ্ধারা একটু খতিয়ে দেখবেন, আশা করি; না করলেও তেমন ক্ষতি হবে না। সৈয়দ আকরম হোসেন, বাংলা বিভাগ থেকে এ-বছর অবসর নিয়েছেন, শেষ করেছেন তাঁর দীর্ঘ শিক্ষক-জীবন। এখন নিভৃতে দিনযাপন করছেন। হ্যাঁ, নিভৃতেই দিনযাপন করছেন সৈয়দ আকরম হোসেন, এ-ব্যাপারে আমি বা আমরা নিশ্চিত; কারণ তাঁর চরিত্র সে কথারই জানান দেয়, দিয়ে আসছে বহুবছর ধরে। তবে এই নিভৃতি আরও মগ্ন হয়ে তাঁর শিক্ষাদীক্ষাজ্ঞানকে ছাত্র-ছাত্রীদের বাইরে অন্যদের উজার করে দেয়ার অনবসর যাপন।

গোড়া থেকে শুরু করা যাক, অন্তত আমি যতটা তাঁকে জানি, বলব সে-সব কথা সৈয়দ আকরম হোসেনকে নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে তাঁর পড়তে আসার দীর্ঘ না হলেও দারুণ একটা ইতিহাস আছে।

ষাটের দশক, সৈয়দ আকরম হোসেন তখন পড়ছেন যশোরের এম এম কলেজে। সে-সময় সদ্য প্রকাশিত ‘কবর’ নাটক নানা জায়গায় বেশ আলোচনার ঝড় তুলেছে। মুনীর চৌধুরী সে-নাটক নিজেই নিজের উদ্যোগে জেলে বসে যেমন লিখেছিলেন; তেমনি তিনি এ-নাটক মঞ্চস্থও করেছিলেন জেলে বসে, জেলের আরো অনেককে সাথে নিয়ে। সেই নাটকেরই মঞ্চায়ন হলো সরকারি এম এম কলেজে। এবারের মঞ্চ নির্দেশক সৈয়দ আকরম হোসেন। সেই অনুষ্ঠানে কবি আজীজুল হক ঢাকা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন মুনীর চৌধুরীকে, অতিথি হিসাবে। নিজের নাটকের মঞ্চায়ন দেখলেন মুনীর চৌধুরী। ডাকলেন এই নাটকের প্রধান মঞ্চকর্তা ও কুশীলবদের। আকরম হোসেন আসলেন। মঞ্চের উপস্থাপনা দেখে মুনীর চৌধুরী নিজেই বেশ আশ্চর্য হয়ে এর প্রশংসা করলেন। সেই মঞ্চায়নের দৃশ্য দেখে নাকি অনেকেরই চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল। ‘কবর’ নাটক হয়ে উঠেছিল জীবন্ত, কবরের মতোই বাস্তব। মুনীর চৌধুরী অনুষ্ঠান শেষ করে ঢাকা ফিরে এলেন; সৈয়দ আকরম হোসেনকে বলে গেলেন, ঢাকা গেলে যেন তিনি অবশ্যই মুনীর চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেন।

সৈয়দ আকরম হোসেনের ইচ্ছা তেমন ছিল না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কেননা তখন তিনি যশোর-খুলনা অঞ্চলে স্বৈরাচার আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে লড়ছেন, হয়েছেন বৃহত্তর যশোর জেলার স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্রদের নেতা। ছাত্রদের একত্রিত করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করছেন; আন্দোলন করছেন স্বৈরাচার আইয়ুব খান ও নব্য-উপনিবেশবাদী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে, ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সামনে থেকে। কিন্তু ষাটের মাঝামাঝি এলেন ঢাকায়, সিরিয়াসলি পড়াশোনার চিন্তা মাথায় নিলেন। ভর্তি হতে চেয়েছিলেন দর্শনে, এমন চিন্তা-ভাবনা নিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে মনস্থ করলেন। কিন্তু মুনীর চৌধুরীর কথা ভোলেন নি সৈয়দ আকরম হোসেন। গেলেন তাঁর কাছে। পরামর্শ চাইলেন। মুনীর চৌধুরী বিশেষভাবেই বললেন বাংলা পড়তে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাংলার জন্য ভর্তি পরীক্ষায় বসলেন সৈয়দ আকরম হোসেন। ‘কেন বাংলা পড়তে চান’- এই প্রশ্নের উত্তরে সৈয়দ আকরম হোসেন লিখেছিলেন, ‘তিনি আসলে বাংলা পড়তে চান নি, একরকম বাধ্য হয়েই বাংলাতে পড়ার জন্য পরীক্ষা দিচ্ছেন।’ আর সাম্প্রতিক কবিতা বিষয়ে আলোচনার জন্য আরেকটি প্রশ্ন এসেছিল। তার উত্তর দারুণভাবে লিখেছিলেন সৈয়দ আকরম হোসেন। ভর্তি-পরীক্ষায় হয়েছিলেন দ্বিতীয়, প্রথম হয়েছিলেন পরবর্তী কালের স্বনামখ্যাত কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান। কিন্তু রিজিয়া রহমান সে-বছর বাংলায় ভর্তি হননি। অনিচ্ছার সেই বাংলা পড়ার ফল হিসেবে কেবলমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণার জগতটা যে অনেকটাই সমৃদ্ধ হয়েছে, তা এখন আমরা বুঝতে পারি সহজেই।

পড়তে এসেছিলেন অনিচ্ছায়; কিন্তু, পরীক্ষায় হলেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। যোগদান করলেন বাংলা বিভাগে, প্রভাষক হিসাবে। তখন থেকেই বেশ ভালোবাসা ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষকতা শুরু করলেন, বিভাগকে আপন করে নিলেন; জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বাংলা বিভাগ তাঁর কাছে যে আপন হয়েই থেকেছে, বলতে পারি সেটা। মুনীর চৌধুরীর আদর্শও তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। মুনীর চৌধুরীদের মতো ব্যতিক্রমী শিক্ষকদের বড় গুণ ছিল মেধাবী ছাত্রদের সনাক্ত করে, তাদের ভবিষ্যতের পথটা দেখিয়ে দেয়া। সৈয়দ আকরম হোসেন এই বিষয়টা বিশেষভাবে মাথায় রেখেছিলেন। এই কাজটি, সৈয়দ আকরম হোসেন শিক্ষকতা-জীবনের শেষদিন পর্যন্ত করে গেছেন। সবাই যে সব বিষয় ভালোবেসে পড়তে আসেন তা নয়, তবে কেউ কেউ অবশ্যই আসেন। সৈয়দ আকরম হোসেন এরকম শিক্ষার্থীদের প্রতিই দৃষ্টি রাখতেন, যাঁরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু, মেধাবী। নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন তাদের, লক্ষ রাখতেন তারা যেন আত্মবিকাশের সঠিক পথে চলে। এ যেন নতুন ফসল উৎপাদনের আগে বীজ সংরক্ষণের মতো। একজন চাষী যেমন ভবিষ্যতের ফসল ফলানোর জন্য সেরা বীজের ভাণ্ডারটাকে সংরক্ষণ করে, প্রণম্য এই শিক্ষকও সেটাই করে গেছেন। তিনি মেধাবী, উদ্যমী আর শিক্ষকতায় প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সংরক্ষণ আর পরিচর্যা করে গেছেন অনেকটা নীরবে, নিভৃতে। আমরা যারা তাঁর ছাত্র-ছাত্রী ছিলাম, খুব নিবিড়ভাবে লক্ষ করেছি, বাংলা বিভাগের যাঁরা আমার শিক্ষক কিন্তু তাঁর ছাত্র-ছাত্রী, তাঁদের অনেকেই তাঁর স্নেহচ্ছায়ায় মেধা ও মননে বীজ থেকে বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়েছেন। বিভাগের প্রাচীন রূপটি ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়েছে আধুনিকতায়, আধুনিক শিক্ষার ধারায়। হ্যাঁ, আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের কথাই বলছি। বিভাগের সর্বত্রই তাঁর স্বপ্ন ও সম্ভাবনার ছাপ স্পষ্ট। কী শিক্ষকদের মধ্যে, কী পরিকাঠামো বা বিকাশে।

কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। এ জন্যে অনেক বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। বিশেষ করে স্বাধীনতার পরে তাঁর কাজ আরো কঠিন হয়ে উঠেছিল। বাংলা বিভাগের প্রথিতযশা শিক্ষকরা তখন কেউ শহীদ হয়েছেন, কেউ বা মৃত্যুবরণ করেছেন। ফলে, বিভাগে শিক্ষকশূন্যতা প্রকট। সৈয়দ আকরম হোসেন এবারও সারথি, এই সমস্যার সঙ্কট নিরসনের রথে। নিজেই সারাদিন ক্লাস নিয়েছেন। সহকর্মীদের নিয়ে যতটা পারেন এগিয়ে নিয়েছেন সবকিছু। নতুন যারা ভর্তি হয়েছে তাদেরকে নানাভাবে শেখাচ্ছেন, ক্লাসে, ক্লাসের বাইরে; গড়ে তুলছেন শিক্ষকতার জন্য, গবেষণার জন্য। এজন্য সর্বোচ্চটাই দিয়েছেন তিনি। কোনো গাফিলতি করেন নি; যার ফলভোগ করছি আমরা সবাই করছি। বিভাগের চেহারাই পাল্টে গেছে অনেকখানি। ভয় একটাই, স্যারের গড়া শিক্ষকেরা বিদায় নিলে কী হবে? এর উত্তরে অবশ্য বলা যায়, যে-পরম্পরার শুরু তাঁর হাত দিয়ে ভবিষ্যতে এর প্রভাব থেকেই যাবে।

অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছিলেন। তাঁর মাধ্যমেই বাংলা বিভাগে পিএইচডি গবেষণার সূচনা হয়। সেটা ছিল বাংলা বিভাগের প্রথম পিএইচডি; দ্বিতীয়টা আশুতোষ ভট্টাচার্যের; আর তৃতীয়টা আনিসুজ্জামানের। সৈয়দ আকরম হোসেনের পিএইচডি ছিল-অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিমের অধীনে, বাংলা বিভাগে পিএইচডি অর্জনের ক্রম হিসাবে ১১তম। এর পর নিজের কথা মনে হয় আর মনে রাখেন নি সৈয়দ আকরম হোসেন। সক্রেটিসের মতো গবেষণায় সহযোগী হয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক তো ছিলেনই, নতুন যারা কাজ করেছেন তাঁদেরকে নানা ধরনের পরামর্শ আর বইপত্র দিয়ে তাঁদের গবেষণার সহযোগী হয়েছেন। আশির দশকের প্রথম দিকে যে কাজ শুরু করেছিলেন, সেই কাজ এখনো করে যাচ্ছেন। বিভাগ থেকে অর্জিত এমন কোনো ভালো পিএইচডি গবেষণা দেখিনি যে-গবেষণায় তাঁর ঋণ স্বীকৃত নয়।

তাঁর বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ ছিল বাংলা বিভাগে আধুনিক বাংলা কবিতা পড়ানোর জন্য সে-সময় তেমন কোনো ভালো গবেষণাগ্রন্থ ছিল না- কী পশ্চিমবঙ্গে, কী বাংলাদেশে। এই অভাব পূরণের জন্য সৈয়দ আকরম হোসেন বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীদেরকে দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণা করান, নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে, নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে। তাঁরই কল্যাণে আধুনিক কবিদের কবিতা-বিষয়ে গবেষণার ফসল হচ্ছে বিষ্ণু দের কবিতা নিয়ে অধ্যাপক ড. বেগম আকতার কামালের; সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা নিয়ে অধ্যাপক ড. সিদ্দিকা মাহমুদার; বুদ্ধদেব বসুর কবিতা নিয়ে অধ্যাপক ড. মাহবুব সাদিকের কাজগুলি। এই গবেষণাগুলি পরে গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হলে আমাদের উচ্চতর বাংলা ভাষার পঠনপাঠন অনেকটাই আধুনিক হয়ে উঠেছে। এইরকম আরো অনেকে কাজ করেছেন সৈয়দ আকরম হোসেনের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে।

এ তো গেল কবিতার বিষয়। কথাসাহিত্য গবেষণার ‘আধুনিকতাবাদী সমালোচনা-সাহিত্য-ভিত্তি’ দাঁড় করানোর ব্যাপারেও কাজ করেছেন বা সহায়তা দিয়েছেন সৈয়দ আকরম হোসেন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য আলোচনার আধুনিক রীতির সূচনাও করেছেন সৈয়দ আকরম হোসেন নিজেই। তাঁর লেখা ‘প্রসঙ্গ : বাংলা কথাসাহিত্য’ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয় নি, এমন গবেষণা কমই দেখেছি। ক্লাসে কথাসাহিত্য-পাঠ আর বাইরে গবেষণার মধ্যে সাধারণত আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যায় পণ্ডিতদের ক্ষেত্রে। কিন্তু সৈয়দ আকরম হোসেনের ক্লাসে যারা তাঁর কথাসাহিত্য পড়ানোর সঙ্গে পরিচিত, তারা মানতে বাধ্য হবেন, তাঁর কথাসহিত্য-গবেষণায় প্রযুক্ত স্টাইলটাও প্রায় সমরূপ। ক্লাসে যেভাবে পাঠদান করতেন তাঁর লেখাও সেভাবে মিলে যায়। সৈয়দ আকরম হোসেন ক্লাসে ভালো পড়াতেন আর বাইরে ফাঁপা গবেষক; কিংবা সৈয়দ আকরম হোসেন ক্লাসে মন্দ পড়াতেন আর বাইরে ভালো গবেষক- একথা বলার সুযোগ নেই। কারণ ক্লাসে আর গবেষণায় প্রায় সমানে সমান ছিলেন সৈয়দ আকরম হোসেন।

শিক্ষক হিসেবে নিয়ম-কানুনের ক্ষেত্রেও সৈয়দ আকরম হোসেন কতটা নিষ্ঠাবান ছিলেন, তাঁর যে কোনো ছাত্রের কাছে জিজ্ঞাসা করলেই জানা যাবে। তাঁর এমন সব ছাত্র আছেন এ ব্যাপারে কথা বলার, আমার বলাটা সেখানে ধৃষ্টতা হয়ে যাবে। তবু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, তাঁর সময়ানুবর্তিতা আর নিষ্ঠা ছিল অতুলনীয়। স্নাতকোত্তরের ছাত্র থাকা কালে প্রথম সেমিস্টারে পেয়েছিলাম তাঁর একটা ক্লাস, ওই প্রথম আর ওই শেষ; বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের কোর্স ছিল সেটা। স্যার ক্লাস নিতেন সকাল আটটায়; এক মুহূর্তের নড়চড় নেই। আমরা ক্লাসে যাই বা না-যাই তাতে স্যারের কিছু আসতো যেত না; স্যার ঠিক সময়ে এসে ক্লাসে হাজির। আমরা চোখ মুছছি, স্যার সব দেখছেন, দু’একজনকে বলছেন এটা-ওটা; পড়িয়ে যাচ্ছেন ঠিকঠাক। সত্তর পার হবার পর সাধারণত ‘বাঙালের’জবুথবু অবস্থা হয়, শিক্ষক হলে তো আরও মিইয়ে যান, কিন্তু সৈয়দ আকরম হোসেনের বেলায় কখনও সেটা ঘটতে দেখিনি, এমনকি যতদূর জানি এখনও নয়। মগজের সবটাই তাঁর সচল। আমরা দু’ঘণ্টা ধরে লুকাচীয় সাহিত্যপাঠ নিতাম, কিন্তু বিরক্তি আসতো না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম তাঁর লেকচার। আর আটটার ক্লাসে তাঁর আসতে দেরি, এমনটা কখনও ঘটেনি। আমি তো স্যারকে দেখেছি একটা সেমিস্টারে একটা কোর্সে, ছয় মাস ছিল যার প্রাণ; আমার অগ্রজেরা দেখেছেন আরো বেশি।

এবার আসি আরেকটা বিষয় নিয়ে, সৈয়দ আকরম হোসেন বেশি কিছু লিখলেন না কেন, এরকম একটা কথা কেউ কেউ বলেন। তিনি যা লিখেছেন তার চেয়ে আরো বেশি লিখলে আমাদের গবেষণা-সাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হতো, বলা হয় এমনটাই। কথাটা সত্যি। কিন্তু এমন লেখক-গবেষকও তো আছেন যিনি একটা যুগান্তকারী বই লিখেও বেঁচে থাকেন। সৈয়দ আকরম হোসেন সেই ধারারই লেখক। লিখেছেন খুবই কম, কিন্তু যা লিখেছেন তাই বাঁচিয়ে রাখবে তাঁকে। কারণ বেঁচে থাকার জন্য লেখার-জগতে বেশি লিখতে হয় না; লেখার মতো লেখা হলে, কম লিখলেও চলে।

কীথ থমাস Religion and the Decline of Magic গবেষণা গ্রন্থটি প্রণয়ণ করতে আঠারো বছর সময় নিয়েছিলেন, এটা ছিল তাঁর প্রথম আর বিখ্যাত বই। এই একটি বই-ই তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে। ইতিহাসের দুনিয়ায় সবিশেষ হয়ে আছেন কীথ টমাস, থাকবেনও। তেমনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস আলোচনায় ‘রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : চেতনালোক ও শিল্পরূপ’ বিশিষ্ট একটা গবেষণা হয়ে থাকবে। বিশেষভাবে উল্লিখিত হতে থাকবেন সৈয়দ আকরম হোসেন। কারণ এইরকম কাজের দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত নেই।

উদ্ধত আর মূর্খ হিসাবে আমার বেশ পরিচিতি আছে। জ্ঞানের যারা গরিমা দেখান আমি সেই দলের নই। কিন্তু একজনেরও কপালে জুটেছিল সৈয়দ আকরম হোসেন স্যারের ভালোবাসা। মাত্রই তো একটা কোর্সের ছাত্র ছিলাম আমি, তারপরও। এই নিপাট মূর্খ নানাভাবে মূর্খামি ছোটানোর এখনও তাঁর পরামর্শ পেয়ে আসছে। আজ স্যারের জন্মদিন; চারদিকে ঢোলের বাদ্যও শোনা যাবে না, পটকাবাজিও হবে না। কিন্তু আমরা যাঁরা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি, তাদের মন আজ স্যারের কথা স্মরণ করলেই হৃদয়ে হাজারটা ঝাড়বাতি জ্বলে উঠবে। শুভ জন্মদিন, স্যার। পরিশেষে আবার এ-লেখার শিরোনামটিকে স্মরণ করে তাঁর উদ্দেশেই বলি, ‘কে আর বাজাতে পারে পাখি তোমার মতো?’

লেখক-প্রাবন্ধিক সোহানুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র। বর্তমানে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করছেন।

Share Now শেয়ার করুন