সৈয়দ আকরম হোসেন >> অগ্রন্থিত ভা ষ ণ >> শ্রদ্ধার্ঘ্য আকতারী মমতাজ ও সরকার আমিন

0
803

অগ্রন্থিত ভাষণ

দ্বিতীয় হরপ্রসাদ-শহীদুল্লাহ্ স্মারক বক্তৃতায় সভাপতির বক্তৃতা হিসাবে সৈয়দ আকরম হোসেনের প্রদত্ত ভাষণের লিখিত রূপ

[সম্পাদকীয় নোট : আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের প্রখ্যাত শিক্ষক সৈয়দ আকরম হোসেনের জন্মদিন। এ উপলক্ষে তীরন্দাজ-এর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ তাঁর একটি অগ্রন্থিত গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের লিখিত রূপ প্রকাশিত হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ আয়োজিত “হরপ্রসাদ-শহীদুল্লাহ্ দ্বিতীয় স্মারক বক্তৃতা” দিয়েছিলেন শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন বাংলা বিভাগেরই অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন। এখানে তাঁর সেদিনের সভাপতির ভাষণটির লিখিত রূপ প্রকাশিত হলো।]

আজকের এই অনুষ্ঠানের স্মারক বক্তা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, তিনি আমার অগ্রজ, শ্রদ্ধেয়। প্রধান অতিথি, কবি ও অধ্যাপক ডক্টর মুহম্মদ সামাদ। মানবিকবিদ্যা অনুষদের মাননীয় ডিন মহোদয় জরুরি কাজে অনুপস্থিত আছেন এখন; তাঁর বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। বাংলা বিভাগের সভাপতি ভীষ্মদেব চৌধুরী, আমার সামনে যাঁরা বসে আছেন তাঁরা অনেকেই আমার এখনো সহকর্মী-শিক্ষক, অন্য বিভাগের শিক্ষক; যাঁদেরকে আমি চিনতে পারি, এবং বিদ্যার্থীবৃন্দ; বলবো আমার প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ – সবাইকে আমার প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাই। বিশেষত, আজকের এই তাৎপর্যপূর্ণ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমাকে সভাপতিত্ব করবার সুযোগ দেওয়ার জন্যে আয়োজকবৃন্দদের কাছে আমি আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

আমার মনে হচ্ছে, আসলে আমার আর কিছুই বলার নেই। কারণ এই যে, স্মারক বক্তৃতা আপনারা শুনেছেন, মুদ্রিত আকারে সররাহকৃত বক্তৃতাটি পড়েছেন। তারপর দেলোয়ার হোসেনের বক্তৃতায় ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র কর্ম, তাঁদের তৎকালীন প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে তাঁদের যে প্রতিবাদ, এগুলো আমরা জেনেছি।

কবি মুহম্মদ সামাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আভ্যন্তর অবক্ষয় থেকে শুরু করে, ছাত্ররা ঘুমিয়ে থাকে কেন, এবং তার দায়ভার কার : এসব সম্পর্কেও বলেছেন; এবং তাঁর ঋদ্ধ পঠনপাঠনসূত্র থেকে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। কাজেই সে-অর্থে আমার আর কিছুই বলার নেই।

আবুল কাসেম ফজলুল হক যে প্রবন্ধটি পড়েছেন, আমি মনে করি এটি একটি নির্ভীক সত্য ভাষণ। বিশেষত, সমসাময়িককালে আগে থেকেই সৃষ্ট যে সংকট, যা ক্রমাগত পুঞ্জীভূত হচ্ছে, তার ব্যাখ্যাটি উনি দিয়েছেন; এবং এটি দিতে গিয়ে তিনি ইতিহাসের কাছে গেছেন, গ্রেকো-রোমান সদর্থক ভাবনার কাছে গেছেন, ইতালীয় রেনেসাঁসের কাছে গেছেন; এবং আমাদের এখন যে বিশ্বপুঁজিবাদের নতুন রূপ নতুনভাবে আমাদের মস্তিষ্ককোষের মধ্যে উপনিবেশের বাসা বেঁধেছে : সে কথাটিও উনি বলেছেন; এবং এগুলোকেই তিনি উৎস বলে, এবং এর শাখা-প্রশাখা আমাদের রাষ্ট্রকাঠামো, আমাদের প্রশাসন, আমাদের বিদ্যাব্যবস্থা – সবকিছুর মধ্যেই ছড়িয়ে গেছে।

তাঁদের কথা ধার করেই আমাদের বলতে হবে যে, আমি আগেই বলেছি, আমার আসলে নতুন কিছু বলার নেই, কারণ আমি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের বক্তব্যের সাথে একমত, কেবলমাত্র এই বক্তব্যের উল্লম্ফনধর্মিতা ছাড়া আমি তাঁর বক্তব্যের সবটাই গ্রহণ করি, বিশ্বাস করি এবং আস্থা রাখি। যে কথাটা আমি একটু বলতে চাই, যে সব কথা যে সকলে বলে গেছেন, এমনটাই। কিন্তু সবই যে বলে গেছেন এটা বলতে আমি নারাজ। তবে আমি সবিনয়ে কিছু কথা বলতে চাই, কারণ এখানে আমার বিদ্যার্থী রয়েছেন। আমাকে বলতে তো হবেই, আপনারা ডেকেছেন, আমি এসেছি। আমি যদি এখন বলি যে, স্মারক বক্তব্য যিনি দিয়েছেন তিনি সবই বলে গেছেন, প্রধান অতিথি কিছু বাকি রাখেননি, অথবা প্রধান অতিথি সব সম্পূর্ণ করে গেছেন – এটাই স্বাভাবিক। আসলে সভাপতির রয়েছে নির্দিষ্ট দায়িত্ব। এর বেশি না। কিন্তু আমি আবুল কাসেম ফজলুল হকের যে প্রবন্ধ শুনলাম তা অনেক বড়ো; অনেকসময় অনেক কিছুই খেয়াল থাকবে না। কিন্তু আমি সবিনয়ে নিবেদন করবো এখানে যাঁরা আছেন, তাদের এই প্রবন্ধটি পাঠের জন্য। এটি বুকলেট আকারে যে প্রকাশ করা হয়েছে এ জন্য আমি আয়োজকবৃন্দকে ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা জানাই। কারণ এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ, এটি কাছে রাখা উচিত, এবং ছাত্রদের নিরিবিলি, নিভৃতে, একান্তভাবে বারংবার পাঠ করা উচিত এবং এর শেকড়ায়িত সত্যের কাছাকাছি যাওয়া উচিত।

আমার কাছে মনে হয়েছে যে, আমাদের জীবনে কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়ে গেল। যে অমীমাংসিত সূত্র থেকে আজকের এই প্রবন্ধের জন্ম, প্রবন্ধের মধ্যে লিখিত সংকটের জন্ম। যেমন এখানে শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের কথা বলতে গিয়ে বাংলা ভাষার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান করার প্রসঙ্গ। এ বিষয়ে কেউ কোনো দ্বিমত করতে পারবেন না। আবুল কাসেম ফজলুল হক নিজেই বলেছেন, তবুও আমি এ বিষয়ে একটি কথা স্মরণ করতে চাই, উদ্ধৃত করতে চাই। যাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন তাঁরা, এমনকি ষাটের দশকে, এখনো সক্রিয় আছেন – যাঁরা রাজনীতিতে আছেন, শিক্ষায় আছেন, ব্যবসায় আছেন, নানান জায়গায় আছেন। তাঁর কেউ কেউ গ্রাম থেকে, মফস্বল থেকে – নানান জায়গা থেকে পাশ করে এসে, মানে তখনকার ম্যাট্রিকুলেশন। মাধ্যম ছিল বাংলা। কিন্তু ইংরেজি পড়া হতো। ম্যাট্রিকে উর্দুও পড়ানো হতো। কিন্তু যিনি ম্যাট্রিক পাশ করে কলেজে পড়তেন তখন, আমি স্মরণ করতে পারি, এক বাংলা বাদে আর কোনো বিষয়ই বাংলামাধ্যমে পড়ানো হতো না। কিংবা লেখা হতো না। একটা মফস্বলের ছেলে এসেই যে সে সময়ে ক্লাসে বসেছেন, ইকনোমিক্স, পলিটিক্যাল সায়েন্স, হিস্ট্রি, লজিক – সবকিছু পড়ানো হতো ইংরেজিতে। অর্থাৎ আর্টস থেকে, যেসব প্রতিভার কথা উচ্চারণ করছি , তাঁরা কেউ ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র ছিলেন না। তাঁরা যদি একটা জাতিকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন, আজকে আমাদের মধ্যে কী ঘটলো, কেন আমরা পারছি না? আমরা বাংলাটাও পাচ্ছি না, ইংরেজিটাও  পারছি না। এই না-পারা সহজ একটা ব্যাপার নয়।  এটি নব্য-বাজার অর্থনীতির নামে, বিশ্বায়নের নামে – একটা বড়ো ষড়যন্ত্রের শিকার আমরা। একটি জাতিকে ধ্বংস করতে গেলে তার ভাষাকে নষ্ট করতে পারলে, ভাষা-সম্পৃক্ত মস্তিষ্ককে নষ্ট করতে পারলে – সেই জাতিকে ধ্বংস করতে বেশিক্ষণ লাগে না।

আমি এই কথাটুকু বললাম যে, আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রবন্ধের মধ্যে যে কথাগুলি বলা আছে তার সাথে দ্বিমতের সুযোগ কতটুকু জানি না; তবে আমি জানি, আপনারা এখানে অনেকেই আছেন জানেন যে, আমরা কলেজে গিয়ে ইংরেজিতে পড়েছি, লিখেছি।  বাংলায় পড়া, গ্রামের ছেলে; কিন্তু পেরেছি। কিন্তু এখন আমরা পারছি না।

তো আমি আমার অমীমাংসিত বিষয়ে ফিরে আসি। আমি জানি এর পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আছে এবং আপনারা অনেকক্ষণ কথা শুনছেন। আমি আদতে বেশি কথা বলতে পারি না। আর বেশি লিখতেও পারি না। আমার কাছে মনে হয়, একুশে ফ্রেবুয়ারিতে যে পুষ্প-নিবেদন করতে যাওয়া হয় সেটি কিন্তু – যেটি আমাদের প্রাবন্ধিক বলেছেন – আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস, এই নামে একটা ইন্সটিটিউটও আছে।  প্রাবন্ধিক ও প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরের সাথে মতের মিল রেখে বলতে চাই – আমরা আন্দোলন করেছিলাম রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইয়ের জন্য। সেই একই দাবিতে ধর্মঘট। কিন্তু এখনো কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রভাষা নেই। আমাদের সেই দিনটি হয়ে গেছে মাতৃভাষা দিবস। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই বললে কী দাঁড়াতো? যিনি প্রাবন্ধিক তিনিও বলেছেন – আইন-আদালত, কোর্ট-কাচারি, কর্মক্ষেত্রে বাংলার প্রচলন, বাংলা চালু হওয়া। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবিটা মুছে গেছে। এখন তো তরুণরাও মাতৃভাষা আন্দোলন বলে। কিন্তু বিষয়টা ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। যে-বিষয়টা এখনো অমিমাংসিত। আমাদের রাষ্ট্রভাষা এখনো সর্বক্ষেত্রে বাংলা হয়ে উঠলো না। যদিও বিষয়টা নানান রাজনৈতিক বা অন্যান্য কারণে বারবার বলা হলেও আদতে এটা যেন শুভঙ্করের ফাঁকি। অর্থাৎ কার্যকর ব্যবস্থা কোথাও গ্রহণ করা হচ্ছে না। এখানেই আমরা আমাদের ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন। এখানেই আমরা জ্ঞান তৈরির ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। কারণ শিক্ষকতা মানেই জ্ঞান তৈরি করা এবং তা বিতরণ করা। কিন্তু আমরা ধার করছি এবং দিয়ে দিচ্ছি। তাও নিজের ভাষায় না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়, বড়ো বড়ো জ্ঞানের জিনিস  সমুদ্র থেকে বন্দরে আসবে জাহাজে। তারপর তা যদি আমরা আমাদের জনগণের কাছে নিতে চাই তো গরুর গাড়ি লাগবে, না হয় নৌকা লাগবে – ওটা আমাদের দেশি। অর্থাৎ জনগণের কাছে যদি জ্ঞান পৌঁছাতে হয় তো তা হবে নিজ ভাষায়। ফলে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই – আবার বলার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস থাক না, ক্ষতি কী। আমরা কোনো কিছু বর্জন করতে চাইনে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা বর্জনের বিনিময়ে কিছু চাওয়া নয়।

দ্বিতীয়ত আরেকটা ভ্রান্তিতে আমরা আছি। স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের স্বাধীনতা নিয়েও নানা ধরনের মতবৈচিত্র্য দেখা যায়, যা অনাহূত। আমি সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে বলতে চাই না – আমি বলতে চাচ্ছি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, যাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন – সেদিন কিন্তু বড়ো কথা ছিল মূল স্তম্ভের মধ্যে একটি হবে সমাজতন্ত্র, যা রাষ্ট্রভাষার মতো মুছে গেছে।  সমাজতন্ত্র শব্দটি অনেকের কাছে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু সমাজতন্ত্র বলতে আমি বোঝাতে চাচ্ছি – ধনের সমবণ্টন, দারিদ্র্যের এবং ঐশ্বর্যের মধ্যের যে ব্যবধান তা কমিয়ে নিয়ে আসার যে প্রয়াস তা হওয়ার কথা ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষের মধ্যে। এর মানে এই নয় যে, একে মারবো, ওকে মারবো – তা নয়। অসাম্প্রদায়িকতার মধ্যে ছিল রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা করবো না। সেটা কিন্তু করা হয়েছে। ক্ষমতার নানা পালাবদলে প্রগতিশীল ক্ষমতা-কাঠামোতেও এর পরিবর্তন আসেনি। কেননা বিষয়টা ক্ষমতা-সম্পৃক্ত।

বলা হচ্ছে, আমি প্রতিনিয়তই শুনতে পাচ্ছি, দেশ উঁচু আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে। আমাদের ধন লুণ্ঠিত হয়ে কতিপয় লোকের হাতের মধ্যে যাওয়া, এবং বিপুল পরিমাণে লোকের বঞ্চিত হয়ে থাকা – এটাকে যদি আমরা গড় ধরি, তাহলে তো সেই হিসেবে বলতেই হচ্ছে যে আমরা উন্নত হচ্ছি। কারণ বাইশ হাজার লোকের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা, অন্যের কাছে নেই। এখন এই অর্থকে যদি আঠার কোটি জনগণ দিয়ে গড় করি  তো আমাদের মাথাপিছু আয় তো বাড়বেই। আদতে ব্যাপারটা শুভঙ্করের ফাঁকি। সামগ্রিক উন্নয়নের সংখ্যাতত্ত্ব ও কাঠামো যদি ঠিক না থাকে তো সেই হিসেবে আমরা বলতে পারি না যে সামগ্রিক ও প্রকৃত উন্নয়ন হচ্ছে।

অন্যদিকে সামাজিক উন্নয়নের কথা শুনছি। সামাজিক উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ আমি বুঝি না। সমাজের উন্নয়ন মানে কি? সমাজকাঠামোর উন্নয়নে যদি সামাজিক নৈতিকতার প্রশ্ন আসে, তখন কী বলা যাবে? কিন্তু সংবাদপত্রের খবরে বলা হচ্ছে উচ্চ-পর্যায়ের দুর্নীতির বিষয়ে যে শঙ্কা তাই প্রকাশ করে সামাজিক নৈতিকতার ভিত ঠিক নেই। সামাজিক উন্নয়নের প্রশ্নের সাথে সামাজিক নৈতিকতার বিষয় বাদ দিলে চলবে না। দুর্নীতির বিষয়টা এখন তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এই দুর্নীতির পিছনের কারণ কী? এর পিছনে বড়ো কারণ পারিবারিক শিক্ষা-ঐতিহ্য। পরিবার থেকেই এ বিষয়ে মানুষ শিক্ষা পেয়ে থাকে। কিন্তু সামাজিক নৈতিকতার ভিত্তির ভাঙনের ফলেই পারিবারিক শিক্ষা-ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দুর্নীতি বেড়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে প্রাবন্ধিকের দ্বৈত-নাগরিকতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান আমলেও আমরা দেখেছিলাম কিছু সুবিধাবাদী লোকজন তাদের ছেলেমেয়েকে বিদেশে পাঠাতো। তারাই নানা স্বার্থে দেশে এসে পরবর্তীতে দেশ শাসন করতো। এই ব্যাপারটাই নতুন করে রূপলাভ করেছে। পাকিস্তান আমলে শত্রু ছিল স্পষ্ট। ফলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বর্তমানের সমস্যাটা নিজেদের ভিতরেই। সমস্যাটাতে আমরা নিজেরাই নিজেরাই। আমরাই যেন আমাদের নিজেদের চিনতে পারছি না। ফলে নতুন লড়াই – যার মাধ্যমে প্রকৃত মুক্তি সম্ভব – সম্ভবপর হয়ে উঠছে না। যে মুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক, সামাজিক, অশিক্ষা থেকে মুক্তি, সাংস্কৃতিক অবক্ষয় থেকে মুক্তি – সেই মুক্তি আন্দোলন এখন আর যুক্তির মধ্যে নেই। বিস্মৃতির মধ্যে চলে গেছে।

বর্তমানে আরেকটা কথা শুনছি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। প্রযুক্তি নির্ভরতায় এই বিপ্লবের কথা চারপাশে উচ্চারিত হচ্ছে। তবে এখানে একটা জটিলতা থেকে যাচ্ছে। আমি কিছুদিন আগে সংবাদপত্রে পড়েছিলাম – ডেল-এর প্রধান নির্বাহী মাইকেল ডেল প্রযুক্তির ভালো-মন্দকে বিবেচনায় এনেছেন মানুষের প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে। এ বিষয়টি তিনি বলেছেন আমেরিকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে, হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীর সামনে। প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টা যে সমাজের অবক্ষয়ের সাথেও সম্পৃক্ত; কেবলই ব্যবহারের মাধ্যমেই ব্যাপারটা নিরপেক্ষতা পেতে পারে – এমনকি বিল গেটসের ছেলেকেও চৌদ্দ বছরের পূর্বে মোবাইল দেওয়া হয়নি। এই প্রযুক্তিও নানাভাবে, ব্যবসায়িকভাবে যত্রতত্র প্রয়োগ করার চেষ্টা চলেছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিকে আমরা বাদ দিতে পারব না। যদি সভ্যতার কথা বলি – তবে এর একটা বড়ো অংশ হলো বিজ্ঞানের চর্চা করতে হবে, মস্তিষ্কের চর্চা করতে হবে, মননের চর্চা করতে হবে, উদ্ভাবনের চর্চা করতে হবে – এটা সত্য, করতে হবে। কিন্তু মনে রাখা দরকার এটা নির্মাণমূলক বিষয়। আরেকটা হলো সৃজনশীল বিষয়। এটিও সভ্যতার প্রাথমিক স্তরের বিষয়। মূলত সৃজনশীল ও নির্মাণমূলক – এ দুটি বিষয় মিলেই সুস্থ সভ্যতা হবে।  অর্থাৎ চিত্তচর্চা ও মস্তিষ্ক-চর্চার সমন্বয় প্রয়োজন। এ দুটো বিষয় সমানভাবে চলার দরকার আছে। কিন্তু চতুর্থ বিপ্লবে মেধা ও মননের চর্চা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু চিত্তের চর্চায় কী আছে? এখানে আছে নীতিশিক্ষা, আছে মনুষত্ব্যের বিষয়, আছে মানবিক সংবেদনশীলতা, মূল্যবোধের চর্চা – যার মধ্য দিয়ে মস্তিষ্ক ও চিত্তের সমন্বয় সাধিত হয়। ডেল যে কথাটি ইঙ্গিত করেছিলেন সেই বিষয়টা, অর্থাৎ আমরা যে অস্তিত্বশীল মানুষ হয়ে উঠবো তার মধ্যে যেমন থাকবে বিজ্ঞান-বুদ্ধি, তেমনি থাকবে সংবেদনশীল মনুষ্য-বুদ্ধি।

মানুষের প্রতি, মানবতার প্রতি দায়িত্ববোধের বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কথা বলি কিংবা সত্যেন বোসের কথা বলি না কেন – তিনিও বোধহয় ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েননি, কিন্তু দিয়ে গেছেন আইনস্টাইন-বোস থিওরি। সেটা এখানেই হয়েছিল। এমনকী জগদীশচন্দ্র বসুর যে চিন্তা-চেতনা, লেখা প্রবন্ধ পড়লে বোঝা যাবে বিজ্ঞান-চর্চা ও ভাষাচর্চা কীভাবে পাশাপাশি চলতে পারে। বৃক্ষের প্রাণ আছে এবং রেডিও আবিষ্কারের বিষয় লন্ডনে উপস্থাপনের জন্য জগদীশচন্দ্র বোসের টাকার প্রয়োজন ছিল – সেই টাকা সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বলেছিলেন আমার জন্য নয়, কিন্তু জগদীশচন্দ্র বসুর জন্য আমি দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করবো; এবং তিনি তা করেছিলেন। তিনি ত্রিপুরার রাজার কাছ থেকে ভিক্ষা করে টাকা সংগ্রহ করে জগদীশচন্দ্র বসুকে দিয়েছিলেন। জগদীশচন্দ্র বসু লিখছেন তাঁর গবেষণার বিষয়ে এক্সপেরিমেন্টের আগে তিনি ভীষণ জ্বরে পড়েছেন, এবং তাঁর বারবার মনে হচ্ছে তিনি পারবেন না, তিনি ব্যর্থ হবেন। কিন্তু তিনি বলছেন, শেষরাত্রিতে একটা স্বপ্ন দেখলাম, একজন বিধবা, একজন মা আমাকে এসে বলছেন, তোমাকে পারতেই হবে – আমি তোমার মা বলছি। তখন আমার মনে হলো – এ আমার মা না, এ আমার দেশমাতৃকা। তাঁর মনে হলো কোনো কিছু সৃষ্টির আগে বিজ্ঞান-বুদ্ধি, চিত্ত-বুদ্ধি ও দেশপ্রেম, দেশের মানুষের কল্যাণ, এই বিষয়সমূহের যদি সম্মিলন না ঘটে, তাহলে কোনো সৃষ্টিই টিকবে না। হকিং বলেছিলেন, পৃথিবীর সমূহ বিনষ্টের মূল হবে বিজ্ঞান-বুদ্ধি ও মূল্যবোধের দূরত্ব। বিজ্ঞান-বুদ্ধিতে মস্তিষ্ক আগে চলে যাবে, আর মূল্যবোধগুলো পিছনে পড়ে যাবে, তখনই কিন্তু সভ্যতা বিনষ্টির দিকে যাবে।

মানুষ এবং কাকের মধ্যে পার্থক্য কী? আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয় আবাসে থাকতাম, তখন দেখতাম সেখানে কাকে অনেক বাসা করেছে। একদিন লক্ষ করলাম ঝড়ে দুটো বাসা উড়ে গেছে। দুটো বাসার বাচ্চারা পড়ে আছে। একটি বাসার বাচ্চার বাবা-মা আছে। তারা সেই বাসার বাচ্চাদের খাওয়াচ্ছে। কিন্তু পাশের বাসার অনাথ বাচ্চাদের খাওয়াচ্ছে না। এটাই পাশবিক বিষয়, পশুবৃত্তি। বিড়াল বিড়ালকে রক্ষা করার জন্য একস্থান থেকে আরেক স্থানে নিয়ে যায়, এটা পশুবৃত্তি। কুকুরপ্রবাহ, কাকপ্রবাহ, শৃগালপ্রবাহ, পৃথিবীকে চালু রাখার জন্য প্রবৃত্তিগতভাবে দায়িত্বপালন করে। কিন্তু মানুষ এক্ষেত্রে ভিন্ন। মানুষ কাকের মতো নিজের বাচ্চাকেই খাওয়াবে না; খাওয়াবে পড়ে থাকা অপরের বাচ্চাকেও। এটাই মনুষ্যবোধ। এ কারণেই মানুষ ভিন্ন। এটাও চর্চা, যদিও এই চর্চা এখনকার সমাজ থেকে উঠে গেছে। উঠে গিয়ে মানুষ হয়েছে পাশবিক, যান্ত্রিক এবং রোবোটিক – যা মানবিক মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক।

এমনকি স্কুলপাঠ্য বই থেকেও নীতিশিক্ষা উঠে যাচ্ছে। নীতিশিক্ষা-চর্চা নেই বললেই চলে। বিদেশের সব ভালো, কিন্তু বাংলাদেশের কিছুই ভালো না, এই ধারণার শিক্ষাব্যবস্থা চলছে। দেশপ্রেম কিংবা দেশমাতৃকার সেবার বিষয়ের চর্চা নেই বললেই চলে। সুতরাং আমি এইটুকু বলতে চাচ্ছি, আমাদের বোধ হয় সেইসময় এসে গেছে যে, পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যখন দেখলো পুঁজি দিয়ে নির্মিত নিজেদের সংকটে যুদ্ধ করছি, তখন তারা জাতিসংঘের মতো সুন্দর আশ্রম গড়ে তুলল, যেখানে আড্ডা-গল্প দেওয়া যায়। আর পাঁচজনকে ভাগ করে রাখলো : নিজেরাই বিশ্বকে নতুনভাবে চালাতে শুরু করলো। তারা এও সিদ্ধান্ত নিল যে তারা আর নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ-কলহ করবে না। কিন্তু পৃথিবীটাকে শোষণ করবো। এই যে বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি, এর মাধ্যমে আমার শোষিত হই, তারও সৃষ্টির সূচনা এখানেই। আমরা ঢাকা শহরে যা দেখছি সমস্ত উজ্জ্বল, তার সমস্তই রক্ত পান করে লাল করে নিয়ে আসায় এতো লাল আর উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। এর বেশি কিছু নয়।

তো মনে রাখতে হবে, এটাই শেষ নয় – থিসিস, সিনথেসিস, অ্যান্টিথিসিস আছে। যে সিস্টেম ‘৪৫ সাল-পরবর্তী কালে এসেছে, বর্তমানে তা অবক্ষয়ের দিকে চলে গেছে। পৃথিবীকে আরেকটা নতুন সিস্টেমের মধ্যে আসতে হবে, যদি পৃথিবীকে টিকে থাকতে হয়। ফলে আরেকটা সিস্টেম আসবে। আমরা দারুণ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। সমস্ত পৃথিবী অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে – যা বিকারের যুগও বটে।

আমি আবার কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি আবুল কাসেম ফজলুল হককে, তাঁর সত্যভাষণের জন্য। আমি কবি অধ্যাপক সামাদের দিকে তাকিয়ে বলছি, সেমিস্টার সিস্টেমের পরিবর্তে বার্ষিক পাঠক্রম চালু করা হোক। পানি হয়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে, ক্লাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এ যায়গায় রাস্তা খারাপ, গাড়ি আসতে পারবে না, ফলে ক্লাস হবে না, অথচ এতসব সমস্যা সত্ত্বেও তিনমাসে পড়িয়ে পরীক্ষা নিতে হয়। এমনকী ষাট নম্বরের জন্য যে পাঠক্রম নির্ধারিত হয়, তার জন্য পাঠক্রমের গ্রন্থসংখ্যা ৫০ কিংবা ৬০। কিন্তু সময় তিন মাস। তিন মাসেই পড়াতে হয় একটা কোর্স। ফলে পড়ালেখায় রিপালসিভ হয়ে পড়ছে ছাত্র-ছাত্রীরা। কাজেই বিজ্ঞান অনুষদের বিষয়গুলো যদি এক বছর ধরে বার্ষিক পদ্ধতিতে করতে পারে, কেন কলাভবনে তা হবে না? বিশেষত সাহিত্য সবজায়গায় এক বছরের বার্ষিক পদ্ধতিতে পড়ানো হয়। কাজেই আমার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন কবি অধ্যাপক সামাদের মাধ্যমে অনুরোধ করবো, আপনারা বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করার প্রথম সোপানটা তৈরি করুন, সেটা হলো বাৎসরিক শিক্ষা-পদ্ধতি। আমি সামাদকেও ধন্যবাদ জানাই তাঁর সত্যভাষণের জন্য, তিনি ক্ষমতায় থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নর্দমা-দুর্গন্ধের কথা উন্মোচন করেছেন। আবারও যাঁরা এখানে আছেন, যাঁরা আমাকে এখানে কথা বলার সুযোগ দিয়েছেন, তার জন্য আমি সকলের নিকট কৃতজ্ঞ। ধন্যবাদ।

লিখিত রূপ : সোহানুজ্জামান কৃত

জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য 

আকতারী মমতাজ >>

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার ঠিক পেছনে কলাভবনের দোতলায় বাঙলা বিভাগ। কৈশোর পেরিয়ে সদ্য তারুণ্যে অভিষিক্ত, উদ্দীপ্ত এই আমি ১৯৭৮ সালের এক সকালে স্নাতক প্রথম বর্ষের ক্লাস করবার জন্য দ্রুতপায়ে কলাভবনের প্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেলাম। ডানদিকে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের কক্ষ। কক্ষের বাইরের দেয়ালে লাগানো নোটিসবোর্ড থেকে টুকে নিলাম স্নাতক সম্মানের প্রথম ক্লাসের শিক্ষকের নাম ও শ্রেণিকক্ষের নম্বর। শিক্ষক সৈয়দ আকরম হোসেন। কক্ষ নম্বর আজ আর মনে নেই। দোতলায় দর্শন বিভাগের দিকের একটি রুম। একটু পরেই শুরু হবে ক্লাস। ভীরু ভীরু পায়ে ঢুকে গেলাম ক্লাসরুমের একঘর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে।

তরুণ প্রাণের কলরব কোলাহল-মুখর ক্লাসে আকরম হোসেন স্যার এলেন ঠিক নির্ধারিত সময়ে।
পরনে অতি সাধারণ স্বদেশী পোশাক, কোরা রঙয়ের খাদি পাঞ্জাবি ও সাদা পাজামা। কোমলে-কঠিনে মেশা এক অভুতপূর্ব মুখচ্ছবি নিয়ে স্যার এসে দাঁড়ালেন পোডিয়ামে। শুরু করলেন তার নবীন ছাত্র ছাত্রীদের প্রথম পাঠদান। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শ্রেণিতে আমাদের প্রথম শিক্ষকের প্রথম পাঠ ছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্যের ওপর। প্রথম বর্ষের সবুজ প্রাণ অবুঝ ছাত্র-ছাত্রীরা সচকিত হয়ে অবাক বিস্ময়ে ক্রমশ ডুবে যেতে থাকলো স্যারের ঐন্দ্রজালিক কথার জাদুতে। প্রথম পাঠদান পর্বে তিনি ফিরে ফিরে বললেন, অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা আধুনিক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য পাঠ ও হৃদয়ঙ্গম করা দুরূহ হবে, যদি না মনোযোগী ও অধ্যঐবসায়ী শিক্ষার্থী হওয়া যায়। হয়তোবা আমাদেরকে সাহিত্যের পাঠগ্রহণে মনোযোগী ও সতর্ক করবার অভিপ্রায়ে তাঁর বক্তব্যে দুরূহ শব্দটি তিনি বারবার ব্যবহার করছিলেন। ক্লাস শেষে আমার এক সতীর্থ দুষ্ট শিক্ষার্থী আওয়াজ করে বলে উঠলো ‘দুরূহ স্যার’। আমিসহ আরও ক’জন সহপাঠী সমস্বরে প্রতিধ্বনি করে ওর সাথে সুর মেলালাম, ‘দুরূহ স্যার’।

মেঘনাদবধ কাব্যের পরবর্তী ক্লাসগুলো থেকেই ক্রমশ আমরা জানলাম, বাঙলা কবিতায় আধুনিক যুগের স্রষ্টা মাইকেল মধুসূদন দত্ত রামায়ণের কাহিনিকে মেঘনাদবধ কাব্যে আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন। রামায়ণের কাহিনির সম্পূর্ণ বিপরীত ‘পয়েন্ট অব ভিউ’ থেকে আলো ফেলে দেখেছেন রাবণ ও রামকে। ‘পয়েন্ট অব ভিউ’ বা ‘কৌণিক দৃষ্টিভঙ্গি’ থেকে মহকাব্যের প্রেক্ষাপটকে, উপন্যাসের বিস্তৃত জীবনকে, চরিত্রগুলোকে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ণ করতে তিনিই শিখিয়েছেন আমাদের। উনিশ শতকের নবজাগরণের চেতনায় উদ্ভাসিত মাইকেল আধুনিক ‘পয়েন্ট অব ভিউ’ থেকে রামায়ণের কাহিনির বিস্তৃত জীবনকে মূল্যায়ন করে রাবণ ও রাম চরিত্রকে পুননির্মাণ করেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে। রাম নয় মেঘনাদবধ কাব্যের নায়ক রাবণ। রাবণের স্বাজাত্যবোধ, আত্মমর্যাদাবোধ, কর্তব্যবোধ, বাৎসল্য ও বীরোচিত অভিব্যক্তি পাঠকের হৃদয়ে তাকে অভিষিক্ত করে অন্য এক উচ্চতায়। পক্ষান্তরে রাম ষড়যন্ত্র-পরায়ন, সম্মুখসমরে ভীতু, পেছন থেকে শত্রুকে আঘাত করবার পরিকল্পনাকারী, ভীরু, কাপুরুষ।

একথাগুলো পড়তে পড়তে অনেকেরই অবধারিতভাবে মনে পড়ে যাবে বাঙলা বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেনের কথা। ক্লাসে মেঘনাদবধ কাব্য পড়াতে পড়াতে শিক্ষার্থীদের একথাগুলো বলতেন তিনি ! ঠিক তাই। একথাগুলো তাঁরই কথা। তবে এ কথাগুলো বা ব্যাখ্যাগুলো তিনি দান করেছেন আমাদের। তাই আজ আমরা বলতেই পারি এগুলো আমাদেরও কথা।

অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন সাহিত্যের পাঠ দানের এক সুনিপুণ কারিগর। তিনি জানেন কী করে উপস্থাপনা, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও চিত্রকল্প সৃষ্টির মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অন্তরে সাহিত্যের মূলরস ও বিষয়বস্তু অতি চমৎকারভাবে পৌঁছে দেয়া যায়। মেঘনাদবধ কাব্যের ক্লাস করতে করতে কখনো কখনো আমাদের মনে হত তিনিই মাইকেল। কখনোবা তারই মধ্যে প্রতিফলিত হতে দেখতাম রাবণের অমিত তেজ, দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদাবোধ, বাৎসল্য ও কর্তব্যবোধ। ব্যাক্তিজীবনে সবসময় প্রচারের বদলে কর্মসাধনই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ দেখেছি। এই সব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা । আমার কাছে তিনি অনন্য উচ্চতায় আসীন এক সর্বাঙ্গীন আধুনিক মানুষ। একজন আধুনিক মানুষ হয়ে ওঠবার যে প্রচেষ্টায় প্রতিনিয়ত আমি নিজে ব্যাপৃত আছি, সেক্ষেত্রে এই শিক্ষাগুরুর ভূমিকাও কম নয়। অভিবাদন প্রিয় শিক্ষক।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চার শিক্ষাবর্ষে সৈয়দ আকরম হোসেনের প্রতিটি কোর্স আমি নিয়েছিলাম। প্রতিটি কোর্সের প্রতিটি ক্লাসে তরুণ শিক্ষার্থীর অন্তরে তিনি আধুনিক জীবনবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির নতুন নতুন দরোজা-জানালা খুলে দিতেন। মনোযোগী, অধ্যবসায়ী শিক্ষার্থীরা সেইসব খোলা দরোজা পেরিয়ে হেঁটে গেছেন বহুদূর। তারা সব জ্ঞানের আলোয় আলোকিত উজ্জ্বল এক-একজন শিক্ষার্থী। আমি মনোযোগী বা অধ্যবসায়ী শিক্ষার্থী ছিলাম না কখনো। নিরন্তর ব্যাপৃত ছিলাম আবৃত্তি, নাট্যচর্চা ও নানাবিধ সাংগঠনিক তৎপরতায়।
প্রথম বর্ষে আমার ব্যাপক উদ্দীপনা দেখে হঠাৎ হয়তোবা কখনো তাঁর মনে হয়েছিল আমি তাঁর উজ্জ্বল শিক্ষার্থীদের একজন হব। অচিরেই তিনি অনুধাবন করেছিলেন আমি সেই দলের নই। তা সত্ত্বেও তাঁর জ্যো তির্চ্ছটা থেকে বঞ্চিত হইনি কখনো। বরাবর আমি তাঁর স্নেহভাজন ছিলাম। মনে করি আছি আজও।

শুভ জন্মদিন, জোতির্ময় ! ভালো থাকুন প্রিয় শিক্ষক। সুস্থ থাকুন। আপনার জ্ঞানের আলো ও স্নেহের আলোয় আরও বহদিন স্নাত হতে চাই।

[এই লেখাটি খুব স্বল্পসময়ে ‘তীরন্দাজ’ সম্পাদকের অনুরোধে লেখা। আমার বলা কথার সামান্য কিছু রেখাচিত্র মাত্র। ভবিষ্যতে লেখাটি পূর্ণাঙ্গ করার ইচ্ছে রইলো।]

সরকার আমিন >>

আমার শিক্ষক প্রফেসর সৈয়দ আকরম হোসেন যেমন প্রতিভাবান, সৃজনশীল, বাগ্মী, গবেষণাপ্রবণ, স্নেহশীল তেমনি সুদর্শনও। শেষোক্ত কারণে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত ছিলাম সহপাঠিনীসম্প্রদায়ের মধ্যে একটা চাপা কুহক সম্প্রসারিত হতে দেখেছি। তাদের কেউ কেউ পছন্দটা স্যারের নিকট প্রকাশ করতেন, “স্যার, আমি আপনাকে ভয় পাই”— বলে। হা হা হা। বাংলাবিভাগের অনেক প্রবীণ ব্যাচের শিক্ষার্থী নারীর ভেতরও এই কুহক-টান আমি দেখেছি। দুঃখিত, আমি স্যারকে নিয়ে একটু দুষ্টুমি করলাম। আশা করি কেউ কিছু মনে করবেন না।
আসলে আকরম স্যার এমন একজন সফল মানুষ যিনি জীবিত অবস্থাতেই কিংবদন্তি হতে পেরেছেন। এমন শিল্পঅন্ত ঈমানদার শিক্ষক এখন খুঁজে পেতে হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কক্ষগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজতে হবে। স্যার ছিলেন এবং আছেনও মহান পথপ্রদর্শক গুরু হিসেবে। তিনি লাস্ট মেহিকান। এরপর আর এমন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক পাওয়া কঠিন হবে। তিনি একজন নেশাগ্রস্থ গবেষক। দেখেছি একটি শব্দ নিয়ে রাতের পর রাত কাটিয়ে দিচ্ছেন। আমার পিএইচডি ডিগ্রিটি তাঁর প্রত্যক্ষ প্রেরণায় সম্পন্ন হয়েছে। যখনই ভেবেছি আমার দ্বারা গবেষণা হবে না, স্যার জাদুবাক্যে আমাকে প্রজ্জ্বলিত করেছেন। তাঁর সাথে কথা বললে অন্তর প্রশান্ত হয়।
স্যারকে নিয়ে বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় নীরবতাই উত্তম বলপেন, যা দিয়ে স্যার সম্পর্কে বলা যায় ভালো। কারণ যিনি মেপে মেপে শব্দ দিয়ে বাক্য রচনা করেন তাঁকে নিয়ে ক্লিষ্ট ম্লান গদ্যে কিছু লেখা বাচালতা করা হাস্যকর। তাই থামলাম। শুভ জন্মদিন স্যার।

Share Now শেয়ার করুন