স্বরলিপি >> রাতের গল্প >> জীবনের গল্পস্বল্প >> ছোটগল্পের বিশেষ সংখ্যা

0
335

স্বরলিপি >> রাতের গল্প >> জীবনের গল্পস্বল্প >> ছোটগল্পের বিশেষ সংখ্যা

ফজরের নামাজ পড়ে ডাক্তার আসবেন। কোন রোগীকে আগে অপারেশন থিয়েটারে ঢোকানো হবে এ নিয়ে নার্সদের মধ্যে কথা চলছিলো। সিজারের জন্য যে রোগীকে আনা হয়েছে তাকে আগে নেয়ার পক্ষে মত দিলেন সিনিয়র নার্স লুবনা। তার আগে একবার কাছ থেকে দেখে আসলেন রোগীকে।
হঠাৎ চিৎকার শোনা গেলো একজন বষষ্ক মহিলা লুবনাকে এসে পায়ে জড়িয়ে ধরে বললো, আমার মেয়েটারে বাঁচাও। রক্ত ভাসে যাতেছে ওর গতর। লুবনা রেগে গিয়ে বললো, আপনাকে আমি চিনি মেয়েকে নিয়ে এর আগেও একবার এসেছিলেন।
হ্যাঁ, সুরমা বেগম এর আগেও একবার মেয়ে মেঘলাকে নিয়ে এ ক্লিনিকে এসেছিলো। মেয়ের অ্যাপেন্ডিক্স–এর অপারেশন হয়েছিল। মেঘলার স্বামী তখনও এরকম ঘটনা ঘটিয়েছিল। লুবনা সে ঘটনা বলতে গেলে সুরমা বেগম মাফ চায়, মানসম্মান খোয়ানোর ভয় তার চোখে মুখে। এর মধ্যে লুবনার মুঠোফোনটা বেজে ওঠে। লুবনা হেসে দিয়ে কথা বলতে বলতে সরে যায়। তার কথার এক আধটু শোনা যাচ্ছিল, রাগ ভাঙছে তাহলে। বলছিলাম না আমি যদি আগে কল দেই তাহলে আমার না লুবনা না।
হঠাত কি যেন হলো, স্যার আসছে আসছে বলে সব তড়িঘড়ি করে কল কেটে ডাক্তারের দিকে এগিয়ে সালাম দিলো লুবনা। বললো স্যার, সেই কেস।
কোন কেস, জানতে চাইলেন ডাক্তার।
উত্তরে গড়গড় করে লুবনা বলতে শুরু করে, স্যার ঐ যে একবার এক অ্যাপেন্ডিক্স-এর রোগীকে দ্বিতীয়বার সেলাই করা লাগছিল, আপনার মনে নেই স্যার; আরে অপারেশন করার পরের রাতে মেঘলার স্বামী মেয়েটার সাথে আকাম করছিল যে…
ডাক্তার বললেন, কিন্তু মেয়েটিরতো মাত্র দুদিন আগে সিজার করা হয়েছে। লুবনা বলল, স্যার, সিজার করার জন্য মেঘলার স্বামী নাকি মেঘলাকে তালাক দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। তারপর আবার মেয়ে বাবু হয়েছে সে তো মেয়েকে নাকি কোলেও নেয়নি। সালা কাঠমিস্ত্রি একটা।
– আগে বাঁচুকতো মেয়েটা।
স্যার, এর আগে কিন্তু দ্বিতীয় সেলাইয়ের জন্য কোনো টাকা তারা দিতে পারে নাই। অল্প-স্বল্প যাইহোক একটা খরচতো আছেই। ক্লিনিকের মালিক এটা বার বার মানবে না- এসব কথা লুবনা বলা শেষ করার পর মৃদু হেসে ডাক্তার বললেন, মালিককে বোঝান, আপনি বোঝালে তো সম্ভব।
ডাক্তারের দিকে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে তাকিয়ে লুবনা বললেন, আমার সাথে ঝামেলা চলছে স্যার। আমি আগে সিজারের পক্ষে, ওরা এখনও নরমল ডেলিভারির আশা ছাড়েনি। আজ কিন্তু সিজারের জন্য মাত্র একটা রোগী পাওয়া গেছে স্যার। ক্লিনিকের কথা ভাবুন। রোগীটা এসেছে স্বাস্থ্যকর্মী সোমার রেফারেন্সে। স্যার এরা টাকাওয়ালা। একটা কেবিন বুক করেছে। আমার মনে হয় সিজারটা আগে করে ফেলেন। স্যার, মেঘলাতো চারজনের সিটা একা দখল করে আছে, মানে রোগী নাই। ওর রুমে বাকী তিন সিট খালি।
ডাক্তার বললেন, ঠিক আছে, সিজারের রোগীকে রেডি করেন।
ক্লিনিকের বারান্দায় অপেক্ষারত একটিমাত্র স্ট্রেচারটি টেনে অপারেশন থিয়েটার রুমে রাখা হলো। লুবনার হাত ধরে পায়ে হেঁটে রুমে প্রবেশ করলো রোগী। জ্বালিয়ে দেয়া হলো সবগুলো বাতি।
ওদিকে, মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে ঝিমিয়ে পড়লো। মেঘলার মায়ের আর কোন আকুতি-মিনতি শোনা গেলো না। মেঘলার ছোট্ট মেয়েটি তখনও পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ পায়নি, তার কান্না চলছিলো থেকে- থেকে।
মেঘলার স্বামী তোয়াব কাঠমিস্ত্রি, কাঠে ভালো নকশা তোলার সুনাম ছিলো তার। ধ্যানী মানুষের মতো কাঠের ওপর জাগিয়ে তুলতো ফুল, লতা ও পাতা। এজন্য ভালো টাকাও পেতো কিন্তু এখন কাঠের ওপর মেশিনে নকশা কাটার চল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কেউ কেউ হয়তো হাতে কাটা নকশা পছন্দ করে কিন্তু বেশি দাম দিতে রাজী হয় না। ডাল থেকে ঝরে পড়ার কাছাকাছি অবস্থায় থাকা একটি জবার মতো প্রায় চুপসে থাকে তার মুখ। সংসারে মন নাই। হাতে টাকা আসলে এক-দুদিনের জন্য নিখোঁজ হয়। মেঘলার কাছে সে স্বীকার করেছে, যৌনপল্লীতে যাতায়াত করে। প্রথম দিন শুনে স্বামীর মুখে থু থু দিয়েছিলো মেঘলা । শুনেই ওর নাকি ঘেন্না করছে সেকথা বলেছিলো। কান্না জুড়েছিলো তারপর ধ্যানী নকশাকারের মতো মেঘলার শরীরে ফুটিয়ে তুলেছিলো লতা, পাতা আর ফুল। তোয়াব এমন আচরণ করলো ওকে পাশ কাটাতে পারে না মেঘলা। সেদিনও পারলো না। এ শিশুর জন্মের জন্য সেদিনের ঘটনাকে মনে করতে পারে মেঘলা। সন্তান পেটে আসার পর মেঘলার শরীর বদলে যেতে থাকে কিন্তু তোয়াবের শরীরীভাষা অতিষ্ট করে তোলে মেঘলাকে। শেষে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিলো, সেখানে গিয়েও নিস্তার পায়নি। তারপর তোয়াব কিছুদিনের জন্য নিখোঁজ ছিল। কোথায় ছিলো জানে না মেঘলা। মেঘলা ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার পর তোয়াব ফিরেছে। আসার সময় নিয়ে এসেছে কদমা। কদমা খাজা মেঘলার প্রিয়। তোয়াব বসা ছিলো মেঘলার মাথার কাছে। কান্নারত শিশুকে মেঘলার বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলো সুরমা বেগম। দু-এক ফোঁটা দুধ খাওয়ার পর শিশুর কান্না আরও বেড়ে যায়। সুরমা বেগম নাতিকে কোলে নিয়ে ক্লিনিকের বারান্দায় হাঁটাচলা করতে থাকা অন্যান্য লোকজনের সঙ্গে কথা বলে। কথা বলতে বলতে চার দিন আগে মা হয়েছে এমন একজনকে রাজি করিয়ে নাতিকে একটু দুধ খাওয়ায়। সুরমা দেখে তার নাতি ঘুমিয়ে পড়েছে। নিজেও ঘুম ঘুম অনুভব করে, শাড়ির আঁচলদিয়ে শিশুটিকে আরও ভালোভাবে বুকের সাথে জড়িয়ে ক্লিনিকের বারান্দায় বেঞ্চে ঘুমভাবে আচ্ছন্ন হয় সুরমা। হঠাত চিতকার শুনতে পায়, সুরমার চিতকার। দরোজা ভেতর থেকে লাগানো ছিলো । সুরমা বাইরে থেকে দরোজায় আঘাত করে। কিন্তু দরোজা খুলছিলো না। লুবনা ফৌজিয়া নার্সকে পাঠিয়ে বলেছিলো, দেখতো কি হচ্ছে। ফাতরা লোকটার আসা দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। যদিও মেঘলার সন্দেহ হয়নি। ভেবেছিল অনেক দিন পরে ফিরেছে, নিশ্চয় সে তার ভুল বুঝতে পেরে ফিরেছে। মেঘলার ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে কিছু সময়ের জন্য অচেনা একজন হয়ে উঠেছিল তোয়াব। তোয়াবের এমন অচেনা হয়ে ওঠা আচরণের কারণে তলপেটের সেলাই সরে সরে যায়, সেলাইয়ের গোড়া দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়। তোয়াব প্রথমে মেঘলার মায়ের সাথে তারপর নার্সদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। এরপর চলে যায়। রক্ত পড়া বন্ধ হয় না মেঘলার।
পাশের কেবিন থেকে শিশুর কান্নার শব্দ পেলো মেঘলা, মানুষের আনন্দ করার শব্দ পেলো তার বুকের ভেতর থেকে সাপের মতো জট খুলে বের হয়ে এলো দীর্শ্বাস। তোয়াবকে সে ভালোবাসে একথা বলার আর কোন উপায় তার কাছে নাই।
ট্রেচারটি নিয়ে হাজির হলো ফৌজিয়া আর নীলা নার্স। আস্তে করে স্ট্রেচারে তুলে নেয়া হলো মেঘলাকে। ডাক্তার মেঘলাকে দেখে নার্স প্রশ্ন করলো, আপনারা সকালে নামাজ পড়েছেন, দোয়া ইউনুস পড়েন। ডাক্তারের চোখের কোণে একফোঁটা জল। মেঘলার পেটে দুটি সেলাই নতুন করে দিতে হলো।
সেলাই শেষ হলে ডাক্তার চলে যান, সরকারি হসপিটালের ডাক্তার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্লিনিকের কাজ শেষ করেন। উনি চলে যাবার পর ডিউটি ডাক্তার এসে ওষুধপত্র কার কি লাগবে সেগুলো দেখেন, কারও রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হলে তার পরামর্শ দেন।
ডিউটি ডাক্তার মেঘলাকে দেখে তার একব্যাগ রক্ত দিতে হবে বলেছিলেন, মেঘলা হেসে বলেছিলো, লাগবে না। ভালো মতো খাওয়া-দাওয়া করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
মেঘলার বুকে দুধ আসে। প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দুধ আসে দেখে সে খুশি হয়, মেয়ের সৌভাগ্য আছে এ বিশ্বাস তার আছে বলে সুরমাকে জানায়।
বলে, মা খুব ভয় পাচ্ছিলাম সত্য তবে আমার মনে হইছিলো মরবো না। আমার মনে হয় মৃত্যু হলে আগে যারা মরে গেছে তাদের হাত ধরে ঘুরে বেড়ানোর মতো ভালো কিছু অপেক্ষা করে থাকে। আমার হাত ধরার মতো কেউ মরে গেছে বলেতো মনে হয় না। তবে স্ট্রেচারে আমাকে যখন আজ সকালে তোলা হলো মনে হলো কেউ আমার হাত ধরে শূন্যে নিয়া যাইতেছে। তারপর আমি ছোট ছোট আলোর ভেতর তার হাত ধরে ঢুকে পড়লাম, সে হাত তোমার হাতের মতো। বেড়িয়ে আসার সময় মনে হলো আমার মেয়ে আমাকে ডাকছে, আমি তার পেছনে পেছনে দৌঁড়ে যাচ্ছি। মেয়ের ছোট পায়ের নিচে মটরসুঁটির ক্ষেত একটু বেঁকে আবার সোজা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। মা আমি বহুদূর দেখে এসেছি। সব তোমাকে বললে তুমি হয়তো পৃথিবীর সমস্ত কষ্টভোগ করে বেঁচে থাকতে রাজি হবে না। মা, এখন আমার ঘুম আসতেছে ঘুম ভাঙলে বারান্দায় হাঁটতে নিও।
সুরমা একহাতে মেঘলার মেয়েকে শক্ত করে বুকের সাথে ধরে থাকে। আরেকহাত ধরে বারান্দায় ধীরে হেঁটে একপাশ থেকে আরেকপাশে গেলো মেঘলা। স্ট্রেচারটির পাশ কাটিয়ে হাঁটলো দুবার। ফিসফিস করে সুরমাকে বললো, মা তোয়াবের নতুন সংসার হইছে।
সুরমা প্রশ্ন করলো না কিসের সংসার। মেঘলা হেঁটে ওর কেবিনে গেল, তারপর চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলো। বললো, মেয়েকে আমার বুকের ওপর শুইয়ে দাও। সুরমা তাই করলো। মেঘলা মেয়েকে বুকের সঙ্গে ধরে বললো, কী সংসার শুনবা, ও এখন যৌনপল্লীর দালাল।

Share Now শেয়ার করুন