হাবীবুল্লাহ সিরাজী >> সীমারেখা, এ প্রান্তে সে প্রান্তে >> স্মৃতিচারণ >> অগ্রন্থিত গদ্য

0
335

সীমারেখা, এ প্রান্তে সে প্রান্তে

সম্পাদকীয় নোট : এই গদ্যটি একটা স্মৃতিচারণ। হাবীবুল্লাহ সিরাজী তখন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পরিচয় হলো তরুণ প্রতিভাবান কবি আবুল কাসেমের সঙ্গে। ঘনিষ্ঠতা থেকে বন্ধুত্ব। কিন্তু এই সময়েই আসে সেই কালো রাত – ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ। জগন্নাথ হলে নিহত হন আবুল কাসেম। তারপর দেশ স্বাধীন হয়েছে। কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী তাঁর স্মৃতিচারণ করে ১৯৭২ সালে এই লেখাটি লেখেন। এ শুধু স্মৃরিচারণ নয়, শুধু আবুল কাসেমের কথা নয়, এই গদ্যের নানা জায়গায় হাবীবুল্লাহ সিরাজীর চমকপ্রদ উপস্থিতিও আমরা লক্ষ করি। আমরা তো এই কথাটা কখনা শুনিনি যে তিনি পত্রিকার (দৈনিক সংবাদ) জন্যে লেটারিং করে দিয়েছেন এবং তা ছাপাও হয়েছে তার কবিতার সঙ্গে। এছাড়া তিনি যে সাহিত্য পত্রিকাটি সেই সময় সম্পাদনা করতেন – ‘স্বরগ্রাম’, তার কথাও পাচ্ছি। অসমান্য এই স্মৃতিচারণ, যেখানে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর জীবনের কিছু কথা উঠে এসেছে। আমরা একথা ভেবেই লেখাটি ‘তীরন্দাজ’-এ প্রকাশ করলাম। এই লেখাটি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কোনো বইতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। প্রকাশিত হয়েছিল ‘বই’ পত্রিকার ডিসেম্বর ১৯৭২–জানুয়ারি ১৯৭৩ সংখ্যায়।

সীমারেখা, এ প্রান্তে সে প্রান্তে

আকাশে আকাশে গোপন হরষে বীণা যে বাজে,
সকল মনোলাজ ফেলে তবে আজ, মাধবী এসো
(যাই তবে সন্ন্যাসিনী : আবুল কাসেম/ স্বরগ্রাম কবিতা সংকলন, অগ্রহায়ণ ১৩৭৭)

প্রাণের সেই আহ্বান, সেই বীণার সুরঝঙ্কর, হৃদয়ের সেই আকাঙ্খা – প্রিয়তম ডাক : ‘মাধবী এসো’ মাধবীর কানে কি পৌঁছেছিলো? মাধবী কি জেনেছিলো – একটি সবুজ হৃৎপিণ্ড কতো দিন তার অপেক্ষায় বসে!
একজোড়া গভীর চোখের সে কী ভাষা, কী আবেদন, কী আকুতি – মাধবী কি…।
না, থাক। হৃদয়ের সবকিছু আজ জমা থাক নিসর্গের খোলা কুঠুরিতে। রক্তাক্ত দেহের অবস্থান হোক কৃষ্ণ মৃত্তিকার শরীরে। হয়তো চেনা যাক কিংবা মিশে যাক সবচিহ্ন, চিহ্নহীন একটা মাংসের পাঁচফুট কয়েক ইঞ্চি কাণ্ড চক্ষু কর্ণ নাসিকা জিহ্বা ত্বকসহ হারিয়ে যাক অদৃশ্য, অজানায়।
সব কি তবে চলে যাবে? হারিয়ে যাবে সব?
কী জানি, হয়তো যাবে। কিংবা যাবে না।
যাবেনা গন্ধবিমোহিত একটি স্বর, একটি ধ্বনি – হৃদয় নিঃসৃত এক একটি শব্দ ঝঙ্কার। বাতাসে বাতাসে সে কথা কইবে। ফুলের সঙ্গে, পল্লবের সঙ্গে তার সখ্য জমবে – আজ থেকে কাল অনাদিকাল তক।

দুই

আমার তখন এমন একটি সময় যখন আমি নিত্যদিন ‘দৈনিক আজাদে’ যাই – গল্প করি, চা খাই, আড্ডা মারি : ভাদ্র কিংবা আশ্বিন মাস, তেরোশ’ সাতাত্তর সাল। তাকে দেখি মাঝে মাঝে, ঠায় বসে আছে – কখনো কাগজে আঁকিবুকি টানছে – আবার কখনো নীরবে অতিমনোযোগে কী যেন লিখছে! কোনো কথা হয় না। সেও আমাকে চেনে না এবং আমিও না। তারপর আরও কিছুদিন গ্যাছে। আমি তাকে দেখছি সে আমাকে দেখছে।
এবং অবশেষে কোনো একদিন আমরা পরস্পর কথা বলেছি। কোনো আনুষ্ঠানিক পরিচয় ছাড়াই জেনেছি সে আবুল কাসেম। কবিতা লেখে। কবি।
তারপর চেনার পালা, জানার পালা। আমরা গভীর হয়েছি, আপন হয়েছি – একসাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি। কবিতার কথা, সাহিত্যের কথা, রাজনীতির কথা – বিবিধ আলাপ; প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে – ক্রমান্বয়ে কখনো একান্ত হয়েছি, কখনো তর্ক করেছি, চা, সিগ্রেটে ডুবে একজনকে অন্যে দেখেছি, অনুভব করেছি।
আস্তে আস্তে সামনের সময় পেছনে গেছে, দৃশময় সবকিছু স্মৃতি হয়েছে এবং এই আমি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, আবুল কাসেমের কথা ভাবছি সেই থেকে যেদিন প্রথম জেনেছি স্বাধীনতা তাকে ফিরিয়ে দেয়নি।

তিন

‘হলে থাকি। রুমের চাবি কোথায় থাকে কাসেম তা জানে। ঘরে ঢুকেই দেখি ও বসে।
কতোক্ষণ এসেছেন?
এইতো মিনিট পনেরো হবে। ক্লাশ শেষ?
হ্যাঁ। কাজ আছে কিছু? না, এমন কিছু না – আবার কিছুও।
যেমন?
কাপড় ছাড়ুন, বলছি।
এমন কোনো কাজ নয়। ‘সংবাদ’-এ ও কবিতা দেবে, তাই কবিতার শিরোনাম ব্লকের জন্য লিখে দিতে হবে, যেহেতু ‘সংবাদ’-এ কোনো শিল্পী নেই। আমি কাগজ কলম নিয়ে বসেছি। এটা ভালো হয়নি, আরেকটি করুন – এই করতে করতে দশ-এগারোটা লিখেছি, তারপর ও তার থেকে একটা বেছে নিয়েছে।
ওর কবিতা পড়েছি – মন্তব্য করেছি সঙ্গে সঙ্গে।
নতুন কিছু লিখিলেন?
আমাকে জিজ্ঞেস করেছে।
খাতাটা বাড়িয়ে দিয়েছি ওর হাতে। ও মনোযোগের সাথে পড়েছে। ভালোমন্দ বলেছে।
একটা কবিতা দিন, ‘সংবাদ’-এ দিয়ে দেবো।
কেন?
দিন, আমি দিয়ে দেবে।
ওকে কবিতা কপি করে দিয়েছি। নিজেরটার সাথে আমারটিও অতিযত্নে পকেটে রেখেছে এবং যথারীতি পরের রোববার আমার লেটারিং করা ওর কবিতা ‘সংবাদ’-এ দেখেছি। আমারটিও বাদ যায়নি।
যখন ইচ্ছে ও এসেছে। আমার রুমমেটরা প্রথম প্রথম একটু বিরক্ত হলেও সয়ে নিয়েছিলো। কোন দিন ঘরে ঢুকতেই দেখি কাসেম আমার বিছানায় লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে।
কি শরীর খারাপ?
না?
মন?
না।
একটু হেসে বলেছে, এমনিই শুয়ে আছি।

তারপর ওর নতুন লেখা কবিতা পড়েছি। আলাপ করেছি। বারান্দার রোদ ছায়া হয়েছে। দু’জনে বাইরে বেরিয়েছি।
তখন আনি আর মেসবাহউদ্দিন আহমেদ ‘স্বরগ্রাম’ বের করছি। প্রধান সংখ্যা বেরিয়েছে। তাতে কাসেমের কবিতা ‘রাত তিনটের জলছবি’ নিয়ে আমাকে কোনো কোনো বন্ধুর কাছে এক বিব্রত হতে হয়েছে । ওরা কবিতার বক্তব্য কি জিজ্ঞেস করলে আমি যথাসাধ্য উত্তর দিয়েছি। একদিন কাসেমকে সেকথা বলতেই ও স্বল্প হেসে বাললো : তাই নাকি?
‘স্বরগ্রাম’-এর দ্বিতীয় সংখ্যা বেরুবে। কাসেমের কাছে কবিতা চেয়েছি। কিন্তু ওর পাত্তাই নেই। ধরতে পারি না। একদিন হঠাৎ পথে দেখা। কি একদম হাওয়া – তারপর আমার কবিতা কোথায়?
দূর, লিখতে পারছি না।
বললেই হলো!
হলো!
অবশ্য পরে ও কবিতা দিয়েছে এবং স্বরগ্রামে তা ছাপা হয়েছে। ‘স্বরগ্রাম’ তৃতীয় সংখ্যা গল্পপত্র হিসেবে বের করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। প্ৰচ্ছদ করা হবে গল্পকারদের ছবি দিয়ে। কাসেমকে সেকথা জানাতে ও চট করে বেলে বসে, তাহলে আমিও গল্প দেবো! (জানতাম, ও গল্প লেখে না )
কিন্তু আপনি তো গল্প লেখেন না?
এবার লিখবো।
‘স্বরগ্রাম’ তৃতীয় সংখ্যা গল্পপত্ররূপেই বেরিয়েছিলো, কিন্তু প্রচ্ছদে লেখকদেৱ ছবি ছিলো না। এবং কাসেমও সে-সংখ্যার গল্প লেখেনি।
এ সময় কিছু দিন কাসেম ‘আজাদ’-এ চাকরি করছে। নানা কারণে শেষ পর্যন্ত আর চাকুরিতে টিকে থাকা সম্ভব হয়নি।
যতদূর মনে পড়ে আমার সঙ্গে ওর শেষ দেখা একাত্তরের ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে। জগন্নাথ হলের পশ্চিম দিকের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছিলাম। কোনো একটা কারণে ক’দিন আগে ওর সাথে আমার একটু মনোমালিন্য হয়ে গেছে। সেদিনও তার জের চলছিলো। দুজনই দূর থেকে কথা বলছিলাম। কেউ যেন আর আগের সেই রেশ ছুঁতে পারছিলাম না।
একসময় ও চলে গেছে, আমিও ফিরে এসেছি হলে। কিন্তু মনের ভেতর একটা কাঁটা বিঁধেছে বারবার।
আজ বাহাত্তরের এই নভেম্বর মাসে ওর কথা মনে হতেই সেই কাঁটাটা আবার রক্ত ঝরালো, বললো : তুমি স্বার্থপর. বন্ধুর জন্য সামান্য একটা উপকারও তুমি করতে পারোনি।

চার

মার্চের শুরু থেকে সারা দেশ ফুস্ছে। হৃদয়ের উত্তাপে অগ্নিময় হচ্ছে বায়ু, চরাচর, প্রকৃতি।
এবং সহসা পঁচিশ তারিখের রাতে ঢাকা শহরের সব বাতি নিভে গেল। নিথর হলো হৃৎস্পন্দন। বিষময় অগ্নিকাণ্ডে ভস্ম হলো নিসর্গের সবুজ সম্ভার।
আর লাশে লাশে যখন প্রাসাদ উঠতে চাইলো, তখনো জগন্নাথ হলের কোনো এক ঘরে আবুল কাসেম – এক তরুণ কবি – নীরবে তার শেষ কণ্ঠ হয়তো ইথারে ছড়িয়ে দিলো :

তবে কী দিনের আলোর পথ চিনে চিনে
আঁধারিমা দিকচিহ্নহীন, তবে কী শূন্যতাই
সাতসাগরের অরূপ নিবাস।

(বিদায় সন্ন্যাসিনী : আবুল কাসেম/ সংকলন বিচিত্রা, আশ্বিন ১৩৭৭)

Share Now শেয়ার করুন