হামিদ কায়সার >> শেষ ইশকুলে যাওয়া হলো না বুলুর >> প্রয়াণলেখ

0
152

 

হ্যাঁ, বুলবুল ভাই চাইছিলেন, খুব খুব চাইছিলেন, তুমিলিয়ার সেই স্কুলটিতে যেতে, ক্লাসে ক্লাসে ঘুরতে, দীর্ঘ বারান্দায় হাঁটতে, তারপর বুলবুল গ্রন্থাগারে দাঁড়িয়ে গভীর অভিনিবিশে বইগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে। বারবারই বলতেন আমাকে, যখনই দেখা হতো, ‘হামিদ, আমরা কিন্তু দল বেঁধে যাব, কেমন! আপনি, আমি, ধ্রুব এষ.. ‘

তালপাতায় নয়, শ্লেটে নয়, নয় কাগজে-কলমেও বুলবুল চৌধুরীকে অ আ ক খ শেখানো হয়েছিল কুড়ায়। হ্যাঁ, বারান্দায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কুড়ার মধ্যে। যারা গ্রামীণ জীবন দেখে এসেছেন, তারা অবশ্যই জানেন ঢেঁকিতে হোক বা মেশিনে – ধান ভাঙানোর পর যে চাউল উৎপন্ন হয়, তার শরীরে লেগে থাকে মিহি মসৃণ কুড়া। তারপর বাড়ির কর্ত্রী, বউঝি অথবা কাজের মানুষ নিয়ে বারান্দা বা উঠানে বসে যায় কুলা নিয়ে। কুলা দিয়ে ঝেড়ে চাউল থেকে কুড়া ছাড়ানো হয়। তখন অতি সূক্ষ্ণ মিহি কুড়া কাছাকাছি চারদিকে স্তরে স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী জায়গায় কুড়ার প্রলেপ এত মোলায়েম এবং মসৃণ হয় যে, সেখানে কিছু লেখা বা আঁকার লোভ সংবরণ করতে পারে না অনেক শিশু। অনেক সময় বড়রাও মনের অজান্তে লিখে ফেলে কোনো কথা বা প্রিয় কারো নাম। তো, সেই কুড়ার মধ্যেই খেলাচ্ছলে বুলুর নানি হালিমা খাতুন ছোট্ট নাতিকে দিয়েছিলেন প্রাথমিক অক্ষরজ্ঞান। যে-শিশুর লেখাপড়া শুরু হয়েছিল ধানের ঘ্রাণের ভিতর দিয়ে, সেই ছেলেটি ভবিষ্যতে যদি লেখক হিসেবে আবির্ভূত হন, তার লেখায় গ্রামীণ প্রকৃতি, সৌন্দর্য এবং জীবন সূক্ষ্ণভাবে পল্লবিত হবে না তো কার হবে?

তাঁর গল্প এবং উপন্যাসের নামকরণ থেকেই বোঝা যায়, গ্রামীণ প্রকৃতি এবং মানুষকে কতটা গভীরভাবে আত্মস্ত করেছিলেন তিনি। তাঁর সাহিত্যে সমকালীন সমাজ-বাস্তবতার সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্রাম-বাংলার চিরন্তন মিথ ও গাথা। আখ্যানে তো বটেই, বর্ণনাভঙ্গির প্রতি পলে এবং শব্দচয়নের নিজস্ব বুননে প্রমাণ করেছেন, তিনি স্বতন্ত্র এবং আলাদা।

বুলবুল চৌধুরী যে খুব বেশি লিখেছেন তা কিন্তু নয়, বরং জীবনের অনেকটা সময়ই অপচয় করেছেন নানা ঘোরে ও নানান বেঘোর আড্ডায়। তাঁর ছোটগল্পের বইয়ের সংখ্যা মোটে তিনটি – টুকা কাহিনী, পরমানুষ মাছের রাত। উপন্যাস লিখেছেন ইতু বৌদির ঘর, ঘাটের বাঁও, এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে, তিয়াসের লেখন, মরম বাখানি, ভাওয়াল রাজার উপাখ্যান, পাখিটি ছাড়িল কে, জলটুঙ্গি, পাপ ও পুণ্যি। শিশুতোষ গ্রন্থ – গাঁও গেরামের গল্পগাঁথা, প্রাচীন গীতিকার গল্প। কলাম – মানুষের মুখ, অতলের কথকতা, জীবনের আঁকিবুকি। এছাড়াও সম্পাদনা করেছেন নটী বিনোদিনী রচনাসমগ্রসহ বেশ কয়েকটি বই।

তাঁর গল্প এবং উপন্যাসের নামকরণ থেকেই বোঝা যায়, গ্রামীণ প্রকৃতি এবং মানুষকে কতটা গভীরভাবে আত্মস্ত করেছিলেন তিনি। তাঁর সাহিত্যে সমকালীন সমাজ-বাস্তবতার সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্রাম-বাংলার চিরন্তন মিথ ও গাথা। আখ্যানে তো বটেই, বর্ণনাভঙ্গির প্রতি পলে এবং শব্দচয়নের নিজস্ব বুননে প্রমাণ করেছেন, তিনি স্বতন্ত্র এবং আলাদা। টুকা কাহিনির গল্পগুলোর পাঠ নেওয়ার পর মনে প্রশ্ন চলে আসে, বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রকৃতি ও মানুষকে কি এতটা জীবন্তভাবে আর কেউ তুলে আনতে পেরেছেন? বিশেষ করে একসময়ের ভাওয়াল পরগণা এবং অধুনা গাজীপুরের মানুষের ভাষা, রীতি ও ব্যবহারকে আমূল মাটিসুদ্ধ সার্থকভাবে গ্রোথিত করেছেন গল্পমালায়। বুলবুল চৌধুরীর গল্পপাঠেই বোঝা যায়, তিনি আকণ্ঠ ডুবে ছিলেন জলকাদায়, তাঁর গল্প থেকে মাটির গন্ধ এসে নাকে লাগে, কানে শোনা যায় ঝিঁঝি পোকার তারস্বর! শুধু যে নান্দনিক প্রকাশ তা-ই নয়, অনুপস্থিত নেই জীবনের দগদগে বাস্তবতা অথচ তা সম্মোহিত ভাষাগুণ আর ঝাঁ-চকচকে আধুনিক উপস্থাপনের জোরে কতই-না শিল্পসুষমামণ্ডিত! চিরকালীন গ্রামীণ ছবি অথচ তাতে গ্রাম্যতা নেই সামান্যও।

এই যে সমকালীন বাস্তবতাকে চিরকালীন প্রবহমানতার স্রোতে সংযোজন; এ দেখার দৃষ্টি বা গভীর জীবন বোধ, তিনি কোথা থেকে পেলেন, কীভাবে অর্জন করলেন বলার প্রাকৃত স্বভাব? এসব কিছুর স্বরূপ উদঘাটন করতে হলে আবারো ফিরে যেতে হবে বুলবুল চৌধুরীর শৈশবের কাছে! সন্দেহ নাই, বুলবুল চৌধুরী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে জীবনের কাছ থেকে পাঠ নিয়েছিলেন অধিক। এটা সম্ভব হয়েছিল নানি হালিমা খাতুনের কারণে। বুলবুল চৌধুরীর নানা এবং দাদাবাড়ি ঢাকার কালিগঞ্জের পাশাপাশি দুই গ্রামে। নানা ছিলেন বলধা জমিদারের নায়েব। তিনি একটু আগেভাগেই অবসর নিয়ে দক্ষিণবাগে বাড়ি করে সেখানেই অবসর জীবন কাটাতে উদ্যোগী হন। কিন্তু নিরেট সুখভোগ করা হয়নি মানুষটার। ডাকাতের হাতে এক রাতে প্রাণ দিতে হলো। অসহায় বিধবা নানি একাকীত্ব কাটাতে বুলুর মা সুফিয়া বেগমের কাছ থেকে বড় নাতিকে চেয়ে নিলেন নিজের কাছে। সেই থেকে বাবা-মায়ের কড়া শাসন নয়, নানির স্নেহচ্ছায়ায় বড় হতে লাগলো বালক বুলু।

শীত মৌসুমের সকালসন্ধ্যায় খড়, নাড়া, নাইল্লার গোড়া, তুষে জ্বালানো আগুন পোহাবার আসরের উত্তাপ! গাছগাছালি, পাখপাখালি, কোকিলের কুহুতান বালকের মনকে মায়ামাধুর্য দান করে। দক্ষিণবাগের এই প্রকৃতি এবং প্রকৃতির কোলে ভ্রাম্যমান মানুষ পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে।

দক্ষিণবাগের নানাবাড়ি জীবনে জুটে গিয়েছিল একদঙ্গল নানান বয়সী ছেলে। ওদের সঙ্গে দাপিয়ে বেড়াতেন গ্রামকে গ্রাম। চার বছরের বড় আলেক ভাই এসে যেমন টানতো – ‘বুলু যাইবা নাকি কাছি বাওয়া?’ সমবয়সী চাচাতো ভাই সিরাজুলের সঙ্গে কুনিজাল নিয়ে চলে যেতেন শীতলক্ষায়। এভাবেই সুযোগ পান ঋতুবৈচিত্র্যের সব মধু-উপাখ্যানের ভেতর নিজের সত্তাকে প্রোথিত করার। মনে চিরদাগ কাটে বর্ষার খালবিল, জলাজমি ছাপিয়ে আসা উজানের পানি, মাছ, জলচর, পাখি! জোয়ারের পানির অন্তর্জগতে লুকিয়ে থাকা শাপলা, মামার কলা, ইচাগাছ, হিঙ্গা, পোটকাসহ কত জলজ উদ্ভিদের মায়াময় হাতছানি! শীত মৌসুমের সকালসন্ধ্যায় খড়, নাড়া, নাইল্লার গোড়া, তুষে জ্বালানো আগুন পোহাবার আসরের উত্তাপ! গাছগাছালি, পাখপাখালি, কোকিলের কুহুতান বালকের মনকে মায়ামাধুর্য দান করে। দক্ষিণবাগের এই প্রকৃতি এবং প্রকৃতির কোলে ভ্রাম্যমান মানুষ পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে। যে টুকা কাহিনী গল্পটি তাঁকে বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত করে রেখেছে, সেই টুকাও দক্ষিণবাগের মানুষ। খর্বাকৃতি মানুষটি ছিল বুলুর নিকটতম প্রতিবেশী। খেতো কুইচ্ছা মাছ। সে-কারণে শুধু বুলু না পুরো গ্রামের মানুষের কাছেই ছিল আলোচিত, কৌতূহল উদ্রেগকারী চরিত্র। বুলবুল চৌধুরী ওঁকে যেভাবে দেখেছেন, অবিকল সেভাবেই, তবে তার সঙ্গে কিছুটা কল্পনার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলা সাহিত্যকে একটি সার্থক ছোটগল্প উপহার দিয়েছেন। মাছের রাত, পরমানুষ, কালাকান্দুর ভোরসহ বেশ কয়েকটি গল্প বুলুর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। আসলে বুলবুল চৌধুরীর প্রায় প্রতিটি লেখাই নিজস্ব দেখার ফসল, বানানো জীবন তাতে খুঁজে পাওয়া যাবে না বললেই চলে।

দক্ষিণবাগে বুলুর শৈশব কেটেছে স্বপ্নের মতো, প্রকৃতিমায়ের কোলে-কাঁখে, মেলে দেওয়া পায়ের সিথানে সিথানে। যেখানে সকালে ঘুম ভাঙত পাখির ডাক শুনে। তারপর দিনভর কত রকমের পাখির কিচিরমিচির। রাতেও সে ডাকের বিরাম নেই। একেক রকম পাখির হরেক রকম ডাকের পাখোয়াজে যেন ভুবনটা রাঙা হয়ে উঠতো। বুলবুলি, টিয়া, ময়না, পাপিয়া, ঘুঘু, ফিঙে, দোয়েল, কোয়েল, কোকিল, বউ কথা কও, টুনটুনি। দুপুরবেলা ঘুঘুটা গলা ছেড়ে কী ব্যাকুল সুরে ডাকতো! যখন শিমুল ফুটতো গাছে, হঠাৎ কু-উ কু-উ কু-উ বলে ডাকতে ডাকতে ডানা মেলে উড়ে যেত কোকিল। জানিয়ে দিত ঋতু-বদলের চক্করের খবর। বউ কথা কও পাখির ডাক শুনলেই লেগে যেত হাসিঠাট্টার ধুম। ভরা বর্ষায় নির্জন নিস্তব্ধ রাতে মাঝেমধ্যে শোনা যেত ডাহুকের ডাক। মাছরাঙা, কটা, কাঠঠোকরা তো কারো ধার ধারতো না। কী যে স্বাধীনমতো গাছ থেকে গাছে কঞ্চিকাঞ্চায়, বাঁশে আগাছার ঝোঁপঝাড়ে রাজত্ব করে বেড়াতো লাফিয়ে-দাপিয়ে। হ্যাজাও জ্বালাত কম না। ফলফসলাদির ম্যালা ক্ষতি করেছে। আর সারাক্ষণ ছিল ঝিঁঝিঁ পোকার প্রায় নিঃশব্দ নিরব ঝিল্লিস্বর – চৈতন্যের কোণে কোণে বিরামহীন বাজতেই থাকত। প্রকৃতির এই উদার বিশালত্বের শেষ ছিল না। এমনকি রাতে নানির পাশে শুয়েও দক্ষিণমুখী জানালার সামনে লাগানো হাসনুহেনা ফুলের ঘ্রাণে নিশ্বাস সুরভিতে ভরে উঠত। প্রকৃতির আদরে বেড়ে ওঠা বুলু কবে কোন্ দিন দক্ষিণবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, আমার জানা নেই; তবে এটা নিশ্চিত বলতে পারি, স্কুলে যেতে ওঁর সামান্যও দ্বিধা ছিল না। সানন্দেই ছুটে গিয়েছিলেন বইখাতা হাতে। কেননা, পড়ালেখার ব্যাপারটাকে ততদিনে তার নানিভাই হালিমা খাতুন এতটাই আনন্দময় এবং প্রাকৃতিক করে তুলেছিলেন যে, স্কুলটা শুধু কঠিন জ্ঞান অর্জনের জায়গা বলে মনে হওয়ার কথা নয়। স্কুল মানেই তো অনেক বন্ধু, জোড় বেঁধে খেলা। ভুবনানন্দে ভাসা স্বপ্নের সিঁড়িপথ বেয়ে বেয়ে!

প্রথম স্কুল দক্ষিণবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেমন তিনি সানন্দে গিয়েছিলেন; আমার বিশ্বাস জীবনের দ্বিতীয় স্কুল কেএল জুবিলীতেও উত্তুঙ্গ হয়ে উঠেছিলেন স্বতস্ফূর্তভাবে। যতই শিল্পীমনা হোন না কেন, মন হোক উদাসী পবন, জুবিলী স্কুলে যেতে একটুও গররাজি হননি। এসব কথা কেন এত জোর দিয়ে বলা? তার অবশ্য সঙ্গত কারণ আছে। আমি নিজেও যে বুলবুল চৌধুরীর সঙ্গে আরেকটি স্কুলে যাওয়ার ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিলাম। সে কাহিনি বলার আগে জুবিলী-পর্বের কথাটা সেরে নেওয়া যাক।

১৯৫৭ সালে বুলবুল চৌধুরীর পিতা আবদুল মতিন চৌধুরী ঢাকার পূর্ণচন্দ্র ব্যানার্জি রোডে বাড়ি কিনে পুরো পরিবারকে চিরদিনের জন্য ঢাকায় নিয়ে আসেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, উন্নত জীবন-যাপনের পাশাপাশি সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়ানোর একটা দায় থেকে তিনি ঢাকায় বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকবেন। এখানে এসেই বাবা একদিন বুলুকে ভর্তি করিয়ে দিলেন ঢাকার তিনটি প্রাচীন স্কুলের অন্যতম একটি কেএল জুবিলীতে। এই জুবিলী স্কুলে যদি বুলু ভর্তি না হতেন, তাহলে কী সে লেখক হতে পারতো? হয়তো পারতো, হয়তো পারতো না; তবে লেখালেখির ব্যাপারটা তার ভেতরে এর আগে একেবারেই ছিল না। সেই লেখার বীজমন্ত্র ঢুকিয়ে দিয়েছিল কেবি জুবিলী স্কুলের ক্যাম্পাস। কীভাবে? বলছি।

এ-স্কুলেই বুলু ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হওয়ার পর সহপাঠী হিসেবে পেয়ে যান কথাশিল্পী কায়েস আহমেদকে। তাঁরই মতো হ্যাংলা পাতলা গড়ন, চুপচাপ স্বভাব। লাজুক টাইপ। সবার কাছ থেকে খানিকটা যেন গুটিয়ে থাকা। টিফিন পিরিয়ডের আধাঘণ্টার বিরতিতে মাঠে খেলাধুলা না করে ক্লাসরুমের বেঞ্চিতে বসে নিবিড় মনোযোগ দিয়ে কী পড়েন! একদিন কৌতূহলের তাড়নায় ওর দিকে এগিয়ে যান কিশোর বুলু। কাছে গিয়ে জানতে চান, কী পড়?

বইয়ের প্রতি কায়েস আহমেদের ছিল প্রবল আকর্ষণ। বাসার বই পড়েই কি তার মন ভরে! প্রায় বিকেলেই চলে যেতেন আরমানিটোলা পাবলিক লাইব্রেরিতে। সেখানে মগ্ন হয়ে যেতেন বইয়ের ভেতর, বইয়ের আদিগন্ত প্রসারিত ভুবনে। বুলুর বই পড়ার সুপ্ত নেশাটা বন্ধু কায়েসের সংস্পর্শে এসে পুরোপুরিই জেগে উঠল।

উত্তর এসেছিল শুকতারা। তারপর দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে সময় লাগল না। বুলুও তো পড়ুয়া। গ্রামে যখন থাকতেন সেই দক্ষিণবাগে, শুধু কি বন্ধুদের সঙ্গে হইহল্লায় সময় কাটত? ওঁরও তো অভ্যাস ছিল আলমারিতে পাওয়া রূপকথার বইগুলোতে বারবারই চোখ বুলানোর। সহপাঠীরও সেদিকেই ঝোঁক। স্বভাবের ওই সাযুজ্য ধরেই জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে দুজন একে অপরের কাছাকাছি হলেন। কায়েস আহমেদ প্রথম পরিচয়েই বইয়ের প্রতি বন্ধুর তীব্র আগ্রহ দেখে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন নিজের বাসগৃহে, ‘নিও তবে তুমি। আছে আমার বাসায় কতরকম।’

কায়েস আহমেদের আমন্ত্রণে এক বিকেলে বুলু পৌঁছে গিয়েছিলেন তাঁতিবাজার লেনের মসজিদ-লাগোয়া এক বাসায়। দ্বিতলের ছোট্ট কুঠুরিতে বাবার সঙ্গে কায়েসের বসবাস। বাবা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুর মহকুমা ও থানার বড়তাজপুর গ্রাম থেকে সেখানকার আপনজনদের ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় এসেছেন ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়। সঙ্গে এনেছেন পুত্র কায়েসকে। তিনি পুরানো ঢাকার পাটুয়াটুলি লেনের এল মল্লিক নামের এক জেনারেল স্টোরের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কায়েস আহমেদের মা, ভাই-বোন কিংবা আপনজন সবাই পশ্চিমবঙ্গে। মাসহ স্বজনদের দেখতে চাইলেও ব্যাপারটা তখন সহজ ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা ছেড়ে ওখানে যাওয়া-আসাটা ছিল দিল্লির মতোই দূরঅস্ত! তবে বছর বছর তো দু-একবার যাওয়া পড়তই। তখন ফেরার সময় কায়েস আহমেদ যতটা সম্ভব নিয়ে আসতেন পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের সেরা বই। বুলু কায়েসের সেই বাসায় গিয়ে দেখা পেয়েছিলেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখকের অজস্র বই। এর বাইরেও ছিল কলকাতা থেকে প্রকাশিত তখনকার সময়ের জনপ্রিয় কিশোর পত্রিকা শুকতারার অনেকগুলো সংখ্যা।

বইয়ের প্রতি কায়েস আহমেদের ছিল প্রবল আকর্ষণ। বাসার বই পড়েই কি তার মন ভরে! প্রায় বিকেলেই চলে যেতেন আরমানিটোলা পাবলিক লাইব্রেরিতে। সেখানে মগ্ন হয়ে যেতেন বইয়ের ভেতর, বইয়ের আদিগন্ত প্রসারিত ভুবনে। বুলুর বই পড়ার সুপ্ত নেশাটা বন্ধু কায়েসের সংস্পর্শে এসে পুরোপুরিই জেগে উঠল। সে-ও বই পড়ার তৃষ্ণা মেটাতে বন্ধুর পিঁছু পিঁছু ছুটে গেল পুরনো ঢাকার সেই সমৃদ্ধ লাইব্রেরির প্রকাশনা দুনিয়ায়।

শুধু কি আরমানিটোলা পাবলিক লাইব্রেরি! ঢাকার বৈচিত্র্য নিরিখ করতে দুজন ঘুরে বেড়িয়েছেন নানান আনাচকানাচ, গলিঘুপচি। দুজনই তো ঢাকায় নতুন, আগন্তুক। একজন এসেছেন ভাওয়ালের দক্ষিণবাগ থেকে, আরেকজন পশ্চিমবঙ্গের বড়তাজপুর থেকে। তাই ঢাকাকে ঘিরে কারোরই কৌতূহলের শেষ ছিল না। ঘুরেফিরে দেখতে হবে ঢাকার ভেতরবাহির! বিশেষ করে প্রতি বৃহস্পতিবার আধাবেলা স্কুল করার পর ছুটি মিলে যাওয়ার অবকাশে সুযোগ হতো এই ছুট-ভ্রমণের।

প্রথমে কাছেধারে বুড়িগঙ্গার তীরে লাগোয়া সদরঘাট। সেখানে তখন ছিল মীর জুমলার কামান। লঞ্চঘাটে লঞ্চ আর হরেক রঙের পালতোলা নৌকা দুজনের কল্পনাকে নিয়ে যেত কোন সুদূরলোকে। তারপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিস্তৃত হতে লাগলো দুজনের কৌতূহল যাত্রা, শহর পরিভ্রমণ। এবার দেখা যাক আগুনের পরশমণি কীভাবে জ্বলে ওঠে প্রাণ থেকে প্রাণে!

সেটা ১৯৬৩ সালের ঘটনা। ইতিমধ্যে অনেক শক্তিমান কথাশিল্পীর আবির্ভাবে বাংলা গল্প-উপন্যাসের জগতে আলোড়ন তুলেছে। একুশের চেতনার অগ্নিজ্বলা শপথে ভেতরে ভেতরে একটি স্বাধীন ভূমিরও স্বপ্ন সবার মনে উঁকিঝুকি মারছে। অব্যাহত আছে কায়েস আহমেদ আর বুলুর বন্ধুত্ব। দুজনই তখন ক্লাস নাইনে পড়ছেন। হঠাৎ একদিন স্কুলবার্ষিকীর পাতায় ‘চোর’ নামের একটা গল্প দেখে চমকে উঠলেন বুলু। লেখকের নাম যে কায়েস আহমেদ, উল্লেখও আছে ক্লাস নাইনের ছাত্র। এটা কি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু কায়েসেরই লেখা? কীভাবে সম্ভব! কায়েস তো কোনোদিনও বলেনি যে সে গল্প লেখে। একসঙ্গে থাকেন, একসঙ্গে ঘোরেন, অথচ তিনি কিছুই জানতে পারলেন না? পেলেন না সামান্য টের!
কায়েস আহমেদ যে ওরকমই। যা কিছু করেন চুপচাপ, লুকিয়েচুরিয়ে। বন্ধুবান্ধব কেন, আশেপাশের মানুষও জানতে পারেন না। যা হোক, বুলু স্কুলবার্ষিকীতে গল্পটি দেখে কায়েসের কাছে গল্পের প্রসঙ্গটি তুলতেই কোনো কথা নয়, খানিক লাজুক হাসি হয়ে উঠেছিল তার উত্তর। কিছুদিন বাদে কায়েস বললেন, চেষ্টা করলে তুমিও তো গল্প লিখতে পারো!

এই প্রথম বুলুকে কেউ বললেন, চেষ্টা করলে তুমিও তো গল্প লিখতে পারবে। ব্যস, সূক্ষ্ণভাবে বুঝি কথাটা ঢুকে পড়েছিল বুলবুল চৌধুরীর মস্তিষ্কের প্রবাহে, গভীর মর্মলোকে। যে বুলবুল কিনা সিনেমা দেখতে দেখতে কেবলই স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে পরিচালক হবেন, ডিরেক্টর হবেন, সিনেমার পর সিনেমা বানাবেন, সেই মানুষটার বোধে-চৈতন্যে ছড়িয়ে পড়লো লেখালেখির কীটপতঙ্গপোকা। আর একরকম অনুশীলন তো ছিলই। দেদার পড়া চলছে আউট বই। কায়েস আহমেদ যতবার পশ্চিমবঙ্গে যান, মায়ের কাছে, ফেরার সময় কলকাতা থেকে নিয়ে আসেন অঢেল বই, দুর্লভ বই। এছাড়াও বইয়ের সন্ধানে দুজনের যাওয়া-আসা শুরু হয়েছে বাংলাবাজারে। সেখানে খান ব্রাদার্স, নওরোজ কিতাবিস্তান, মাওলা ব্রাদার্সসহ আরো কত কী নামের দোকানে ঢুকে ঢাকার লেখকদের বইও কিনছেন দুজন। এই সময়ই বাংলাবাজারে পরিচয় হয় কবি এমএ মজিদের সঙ্গে। তিনি একটি প্রকাশনা সংস্থার বেচাকেনা সামলাতেন। বই কিনতে কিনতেই পরিচয়। তিনিও কেন জানি কায়েস আহমেদের মতো বুলবুল চৌধুরীকে লেখালেখির জন্য তাগিদ দিতেন, অনুপ্রেরণা যোগাতেন, যতবারই যেতেন সেখানে, বারবার।

কায়েস আহমেদ যে সেই বয়সেই কতটা পরিণত পাঠক ছিলেন এবং তার আউপাতালি বন্ধুকেও যে সে-বিষয়ে সচেতন করতে চেয়েছেন, তা বোঝা যাবে বুলবুল চৌধুরীর স্মৃতিচারণে, ‘আমাদের সহপাঠী মনোয়ার আহমদের সঞ্চয়ে ছিল শশধরের দস্যু মোহন সিরিজ, স্বপ্নকুমার সিরিজের বাইরেও অনেক রকম দস্যুকাহিনি, রহস্যকাহিনি, ভূতপ্রেত এবং ভয়াল ভয়াল সব কাহিনিতে ভরপুর নানা কিসিমের বই। সে সেধে সেধেই সেগুলো আমাকে পড়তে দিত। গোগ্রাসে সেসব গিলেছি। কায়েস সেদিকে হাত বাড়াবে কি, উলটো আমাকে নিষেধ করত। বলত, ওগুলো বাজে বই। সাহিত্য করতে চাইলে তোমাকে পড়তে হবে সত্যিকারের সেরা লেখকদের রচনা।’

শুধু কি পথপ্রদর্শন? এই যে বুলবুল চৌধুরী নামটা! পিতৃপ্রদত্ত পরিচয়নাম ছিল আবদুর রউফ চৌধুরী। কায়েস আহমেদের পরামর্শ খেয়ালে নিয়ে ডাকনাম বুলবুলের সঙ্গে চৌধুরী পদবি মিলিয়ে নিজের নামটি করে নিয়েছিলেন বুলবুল চৌধুরী। তাঁর তাগাদাতেই লেখা প্রথম গল্প ‘জোনাকি ও সন্নিকট কেন্দ্র।’

বন্ধুকে আরো বোঝাতেন, ‘লিখেই ছাপতে দেবে না। তাতে ক-মাস পর লেখাটা পড়তে গেলেই নিজের অনেক ভুল পাবে। কাটাকাটি দিয়েই কিন্তু লেখা বেশি লাবণ্য পায়।’

জুবিলী স্কুলের পর বুলবুল চৌধুরীকে আর কোনো স্কুলে যেতে হয়নি। এরপর তিনি জগন্নাথে (কলেজ) ভর্তি হলেন। তুখোড় গল্পকার হয়ে উঠলেন। চাকরির পর চাকরি ধরলেন আর ছাড়লেন। বিয়ে করলেন। সংসার হলো। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ। কত পটপরিবর্তন। গল্পের পাশাপাশি উপন্যাস। মনবাজি প্রমত্ত জীবন। আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ! বদলে গেল ঢাকারও নাড়িনক্ষত্র। কালিগঞ্জ দক্ষিণবাগের সেই জলাভূমি উধাও। জীবনে এলেন ধ্রুব এষ। বয়স বাড়লো, কুঁজো হলেন, বলিরেখার পর বলিরেখা পড়লো। কিন্তু বুলবুল চৌধুরীর ভেতর থেকে মরল না বুলু। তার ভেতরের চিরশিশুটি রয়েই গেলো। কী আশ্চর্য সরলতা! মাঝে মধ্যেই শিশুটির উঁকিঝুকি টুঁ। আর কে না জানেন, শিশুদেরই তো যেতে হয় ইশকুলে! ইশকুলই তো বারবার ডেকে নেয় শিশুকে তার বারান্দায়, অলিন্দে, ক্লাস থেকে ক্লাসে। স্বভাবতই সত্তরোর্ধ্ব বুলবুল চৌধুরীরও ডাক এলো আবারো সেই স্কুল থেকে। আর এবার তার স্কুল-যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম আমিও। কীভাবে? তাহলে তো বিস্তারিত বলতেই হয়।

হঠাৎ একদিন ২০১৯-এর মাঝামাঝি সময়ে আনজু ফোন দিয়ে জানতে চাইল, ‘দাদা, আমরা কালিগঞ্জ উপজেলার দুটো স্কুলে দুজন কবিসাহিত্যিকের নামে লাইব্রেরি করতে চাচ্ছি। কার কার নামে করা যায় বলেন তো! কালিগঞ্জের কবি লেখক হলে ভালো হয়।’ আমি কোনো রকম ভাবনাচিন্তা না করেই পরামর্শ দিলাম, আবু জাফর শামসুদ্দিন আর বুলবুল চৌধুরী।

এই সেদিন, ২০১৯ সালের মাঝামাঝি হবে। আমাদের গাজীপুরের এক লক্ষ্মী মেয়ে – আনজুমান আরা আনজু। কালিগঞ্জ উপজেলায় সহকারি শিক্ষা অফিসার। হঠাৎ একদিন ২০১৯-এর মাঝামাঝি সময়ে আনজু ফোন দিয়ে জানতে চাইল, ‘দাদা, আমরা কালিগঞ্জ উপজেলার দুটো স্কুলে দুজন কবিসাহিত্যিকের নামে লাইব্রেরি করতে চাচ্ছি। কার কার নামে করা যায় বলেন তো! কালিগঞ্জের কবি লেখক হলে ভালো হয়।’ আমি কোনো রকম ভাবনাচিন্তা না করেই পরামর্শ দিলাম, আবু জাফর শামসুদ্দিন আর বুলবুল চৌধুরী। আনজু তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র চাইল। জানালাম, আবু জাফর শামসুদ্দিন তো অনেক আগেই মারা গেছেন। তাদের পরিবারেরও কাউকে চিনি না। তবে বুলবুল ভাই বেঁচে আছেন। ভালোই আছেন তিনি। এখনো সৃষ্টিশীল। নিরন্তর লিখছেন। তুমি চাইলে বুলবুল ভাইয়ের নাম্বার দিতে পারি।

ব্যস। নাম্বার দিয়ে দিলাম বুলবুল চৌধুরীর। তার ঘণ্টাখানেক পরেই বুলবুল ভাইয়ের ফোন। কী মিয়া! আমার বিরুদ্ধে এইসব কী ষড়যন্ত্র করতাছেন। তারপর কী উচ্ছ্বাস! একটা স্কুলের মধ্যে আমার নামে লাইব্রেরি হইব, এইটা তো খুব আনন্দের কথা রে ভাই, বড় একটা পুরস্কার। আমি ওই ভদ্রমহিলাকে বলছি, সে লাইব্রেরির জন্য কত বই দরকার! আমি ঢাকা থেকে ট্রাকে পাঠাইয়া দিব বই! হামিদ চলেন একদিন দেখে আসবো স্কুলটা, কেমন! আপনি যাবেন, ধ্রুব এষ যাবে। আমরা দল বেঁধে যাব! ঠিক আছে! আপনাকে কিন্তু যেতে হবে, হ্যাঁ!

কিন্তু বুলবুল ভাই কথা রাখেননি। একমাস যায় দুমাস যায়। কারোরই কোনো খবর নাই। না বুলবুল চৌধুরীর, না আনজুর। তিন মাস পর আমিই একদিন আনজুকে ফোন দিই। কি আনজু তোমাদের লাইব্রেরির প্রজেক্ট কি আছে নাকি নাই?
আনজু বলে, কী বলেন দাদা! কাজ তো অনেক এগিয়ে গেছে। বুলবুল ভাইও আসছিলেন। তাকে স্কুলটা দেখালাম।
শুনে তো আমি তব্দা। বলো কি? আমাকে চুপ মেরে যেতে দেখে আনজু আরো নাড়ায়, কী দাদা, কী হলো, কথা বলছেন না যে?
আনজু! এমন তো কথা ছিল না!
কেমন কথা ছিল দাদা?
তাই তো! কেমন কথা ছিল? কেমন ছিল কথা? কথা ছিল কেমন? ‘ছিল, কী কী যেন…’ আমার সব কেমন গুলিয়ে যায়। ওদিকে আনজু হাসছে। ওর হাসির শব্দ পাই আমি। আর হাসির শব্দ পেয়ে আমি কথায় ফিরি, ‘বুলবুল ভাই না বলছিলেন, আমাদের নিয়ে যাবেন!’
‘হ্যাঁ, আপনাদের তো আনবেনই! আপনাদের ছাড়া কি হবে? আপনে আসবেন, ধ্রুব এষ দাদা আসবেন!’
‘কিন্তু!’
‘না দাদা! কোনো কিন্তু না! আপনে অবশ্যই আসবেন!’
‘কিন্তু বুলবুল ভাইতো আমারে ফালাইয়াই গেল গা…’
‘ও দাদা, ভালো কথা! বুলবুল ভাইকে একটু কল দিয়ে বলবেন তো, ছবিগুলো যেন তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেয়! আমি আর্টিস্ট রেডি করে রাখছি, দেয়ালে উনার ছবি থাকবে… উনি তো গুরুত্বই দিচ্ছেন না… আমি প্রতিদিনই তাগিদ দেই ফোনে। ‘
‘কি বললা?’
‘উনার ছবিগুলো যেন মেইলে পাঠিয়ে দেয়!’
‘না, অই যে কী জানি বললা? প্রতিদিনই? তোমরা কি প্রতিদিনই কথা বলো নাকি?’
‘হ্যাঁ, বুলবুল ভাই তো প্রতিদিনই কল দেয়!

একদিন বাংলাবাজারের এক প্রকাশনা সংস্থার অফিসে গিয়ে তাকে পাকড়াও করি, ‘বুলবুল ভাই, আপনে নাকি তুমুলিয়া গেছিলেন?’
‘আরে মিয়া, বইলেন না, কেমনে কেমনে যে পৌঁছাইয়া গেলাম, নিজেই তো বুঝতে পারি নাই, বসেন বসেন, চা খান।’

এরপর আরও একদিন, আনজু আমাকে ফোন দেয়, ‘দাদা। বুলবুল ভাইয়ের একটা বায়োডাটা লাগবে। দিচ্ছেন না। উনি খালি ধ্রুব এষের কথা বলেন। ধ্রুবদার নাম্বারটা পাঠাবেন।’
‘আচ্ছা পাঠাব। ছবিগুলো কি পাইছো? বুলবুল ভাইয়ের?’
‘হ্যাঁ, মিথুন ভাই পাঠাইছে। কিন্তু আরো ছবি লাগবো। আপনার কাছে যা আছে দেবেন।’
‘আচ্ছা, আচ্ছা দেব।’ তারপর আর কথা পাই না। ওপাশ থেকে আনজু তাড়া দেয়, ‘হাঁ দাদা বলেন…’
আমি আর বলার মতো কথা পাই না। গতবার বলছি দশ মিনিট, আজ পাঁচ মিনিটেই শেষ হলো কথা। ওপাশে আনজু হাসে।
শুধু কি আনজু হাসে? হাসে বুলবুল চৌধুরীও। একদিন বাংলাবাজারের এক প্রকাশনা সংস্থার অফিসে গিয়ে তাকে পাকড়াও করি, ‘বুলবুল ভাই, আপনে নাকি তুমুলিয়া গেছিলেন?’
‘আরে মিয়া, বইলেন না, কেমনে কেমনে যে পৌঁছাইয়া গেলাম, নিজেই তো বুঝতে পারি নাই, বসেন বসেন, চা খান।’
‘আপনে আমারে ছাড়াই গেলেন গা?’ আমার উশপুশানি আর থামে না। বুলবুল ভাই, চশমা ঠিক করতে করতে হাসি হাসি মুখে বলেন, ‘আরে মিয়া হইলো… যাবো তো, কতবার যেতে হবে…’

এ-ভাবে কালিগঞ্জের তুমিলিয়া বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বুলবুল চৌধুরী গ্রন্থাগারের কাজ এগোয়। এগোতে থাকে। ওদিকে ২০২০ সাল চলে আসে। শুরু হয় করোনা। আসে লকডাউন আর নানা রকম বিধিনিষেধ। স্থবির হয়ে পড়ে জীবন। তারপর আসে সেই ভয়ংকর খবর। একদিন কথাশিল্পী মাহবুব রেজা জানান, ‘অপুভাই, শুনছেন নাকি? বুলবুল ভাইয়ের তো ক্যান্সার! উনি কিন্তু জানেন না, জানানো হয় নাই উনাকে!’
আনজু কিছুতেই মেনে নিতে পারল না কথাটা। না, ‘দাদা, কী বলেন! আমার তো বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে প্রতিদিনই কথা হয়! আপনার কথাটা আমার বিশ্বাস হলো না।’
কীভাবে বিশ্বাস হবে আনজুর। ও যে প্রতিদিন একজন প্রাণবন্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলে! তাঁর কণ্ঠে ঝড়েো বাতাসের ওজস্বিতা থাকে, শব্দে শব্দে থাকে জীবনের প্রতি সুধাগন্ধঢালা প্রেম! সেখানে এতটুকু ক্লান্তির ছাপ নেই, নেই অসুখবিসুখের সামান্য বিষাদস্পর্শ!

তারপরও, জোরেসোরেই কাজ সারল আনজু। আর তীব্র সত্যটাও মেনে নিল, বুলবুল ভাইকে দিয়ে কোনোক্রমেই উদ্বোধন করা সম্ভব হবে না তুমিলিয়া বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘বুলবুল গ্রন্থাগার’। সে-কবেই হয়ে উঠেছে অলীক স্বপ্ন। ও একদিন নিজেই ছুটে এলো ঢাকায়, বুলবুল চৌধুরীকে চাক্ষুস করতে। সঙ্গে দলবল – তুমিলিয়া বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিস্টার লিউনি বার্ণাডেট রোজারিও, মুনশুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নন্দিতা দাস, ঘোনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক জেসমিন বেগম সমভিব্যাহারে! আমি আর জিনিয়াস প্রকাশনীর সত্বাধিকারী হাবিবুর রহমান রুবেল বুলবুল ভাইয়ের পক্ষ থেকে এক ট্রাক ভর্তি বই দিয়ে গেলাম তুমিলিয়া বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুলবুল চৌধুরী গ্রন্থাগারে। বুলবুল ভাইয়ের আহ্বানে বাংলাবাজারের প্রকাশকগণ স্বতস্ফূর্তভাবে দিয়েছেন বই, বই দিয়েছেন বুলবুল চৌধুরীর আত্মার অংশ ধ্রুব এষ। সে-বই নিয়ে বুলবুল চৌধুরী গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢুকে অভিভূত হয়েছি। বিশাল এক সুসজ্জিত কক্ষ। রঙে রঙে রঙিন দেয়াল। ঝকঝকে পরিষ্কার। দেয়ালে দেয়ালে বুলবুল চৌধুরীর নানা সময়ের নানা মুহূর্তের প্রতিকৃতি। যত্নে যে এঁকেছেন গাজীপুরেরই চিত্রশিল্পী রিপন সরকার। আনজু জানাল, বইগুলো সব এখন শেলফে শেলফে শোভা পাচ্ছে! লক ডাউন শেষ হলেই উদ্বোধন করব। ‘দাদা বুলবুল ভাইকে কি কোনোভাবেই আনা যাবে না?’
আমি বললাম, ‘তুমি তো নিজের চোখেই দেখেছো আনজু। তারপরও কীভাবে আশা করো!’
আনজুর দীর্ঘশ্বাস, ‘দাদা, স্কুলটা তো বুলবুল ভাইকে চাইছিল, খুব খুব চাইছিল!’

হ্যাঁ, বুলবুল ভাই চাইছিলেন, খুব খুব চাইছিলেন, তুমিলিয়ার সেই স্কুলটিতে যেতে, ক্লাসে ক্লাসে ঘুরতে, দীর্ঘ বারান্দায় হাঁটতে, তারপর বুলবুল গ্রন্থাগারে দাঁড়িয়ে গভীর অভিনিবিশে বইগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে। বারবারই বলতেন আমাকে, যখনই দেখা হতো, ‘হামিদ, আমরা কিন্তু দল বেঁধে যাব, কেমন! আপনি, আমি, ধ্রুব এষ…’

বুলবুল ভাই এবারও কথা রাখলেন না! চুপিচুপিই চলে গেলেন অন্য এক ইশকুলে। দেখা হলে হয়তো বলবেন, ‘আরে মিয়া! কেমনে কেমনে যে পৌঁছাইয়া গেলাম, নিজেই তো বুঝতে পারি নাই…’

কিন্তু বুলবুল ভাই! এ কেমন ফাঁকি! এ কেমন প্রস্থান।

 

Share Now শেয়ার করুন