হামীম ফারুক সাপ | ছোটগল্প

0
58

রোদের তাপে ঘেমে ভিজে গেছে সাহেবালী। এক ফোঁটা ঘাম মাটিতে পড়তেই ভিজে বিন্দুটি মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। ঘরের পেছনে মাঠের দিকে তাকায়। রোদে পুড়ে ফেটে গিয়ে নানা আকার ধারণ করেছে। পানি না হলে জমি চাষ করা যাবে না। জ্যৈষ্ঠ যায়। বৃষ্টির দেখা নেই।
মাথা নাড়াচ্ছে গরুটি। আর খড় নেই। অনেক কষ্টে কিছু খড় যোগাড় করেছিল সাহেবালী। বৃষ্টি নেই, ঘাসও শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে সবখানে। খড়ের মজুত আর কদিন থাকে। কষ্টের দিন এসে গেছে। গরুটিকে ভাল করে বাঁধে সে। গলা, পিঠ মোছে, কোমর থেকে গামছা খুলে। আজ হাটবার। ঘরে কিছু লাউ আছে। বিক্রি করে চাল কিনতে হবে। নইলে রাতে উপোস। উঠোন পেরোতে গিয়ে লাউয়ের ঝাঁকাটি ভাল করে লক্ষ করে। বাঁশের কঞ্চিগুলো এদিক ওদিক বেঁকে আছে। সবুজ চ্যাপটা পাতায় বাদামি ছোপ। বোঝা যায়, অযত্ন হয়েছে। দুদিনের জন্য সদরে গিয়েছিল সে। এক মামলার সাক্ষী হয়ে। কিন্তু বাড়িতে নুরজাহান ছিল। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে ডাক দেয়, অ নুরজাহান।
ঘর থেকে বেরিয়ে আসে নুরজাহান। স্বামীকে গাছ পরখ করতে দেখে বলে, ওডা কী দেখতিছেন, পানি খাতি না পারলে গাছ বাচে?
সাহেবালী তেতে ওঠে। ভেংচি কেটে বলে, গাছ বাচে? এটুকুন গাছের জন্যি কত গুষ্ঠির পানি লাগবি তোর আবাগীর বেটি?
স্বামীর কথায় নুরজাহানেরও মেজাজ চড়ে। বলে, খবরদার কচ্চি, গাল দেবেন না, আমি একলা মানুষ কদ্দিক সামলাবো, অ্যা। পুকুর শুইকিয়ে গেলে পানি কোথায় পাবো, বলেন দিনি। বলি খাবার পানি পাচ্ছিনে তো গাছের পানি। খসে পড়া আঁচল এক ঝটকায় টেনে মাটি কাঁপিয়ে ঘরের পেছন চলে যায় সে। বাচ্চাটি কেঁদে কেঁদে উঠছে। নিশ্চয় আবার ক্ষিদে পেয়েছে।
সাহেবালী স্ত্রীর চলে যাওয়া দেখে। পায়ের কাছে মোরগটি অনেক্ষণ ধরে হেলেদুলে হাঁটছিল। অকারণে সেটিকে লাথি কষাল সে। হঠাৎ উপদ্রবে মোরগটি কঁকাতে কঁকাতে ডানা ঝাপটিয়ে ছুট দিল দিগ্বিদিক।
ঘরের পেছনে তাদের শোবার জায়গা। সেটি লাগোয়া এক চিলতে ডোবার মতন একটি বড় গর্ত। এ ঘরটি তোলার সময় মাটি খোঁড়া হয়েছিল। বর্ষায়, কারণে অকারণে বৃষ্টিতে সেটির ভেতর পানি জমে। যদিও শীতের সময় তাতে পানি একদমই থাকে না। উপরন্তু এবার মৌসুমে বৃষ্টি হয়নি। ডোবা শুকোতে দেরি হয়নি। আপাতত কাজ চলেছে টিউবওয়েলের পানিতে। সেই পানি আবার আনতে হয় মাইলখানেক হেঁটে চেয়ারম্যান বাড়ির সামনে থেকে। গা-গোসলের জন্যেও যেতে হয় সেখানে।
ছেলেটা এখনো কেঁদে চলেছে। সাহেবালীর বিরক্তি বাড়ে। আবারও চেঁচিয়ে ডাকে, অ নুরজাহান, বলি ছাওয়ালডা অ্যাতো কাদে কেনে? মাই দিতে পারিস না?
ভেতরে নুরজাহান কিছু একটা করছে। সেটি করতে করতে খেঁকিয়ে ওঠে সে, পারব না। রাক্ষস একটা।’ তার গলায় রাত্রি জাগরণের ক্লান্তি।
সাহেবালী অবসন্ন বোধ করে। সে এতক্ষণ উঠোনে ছিল। এবার রোদ বাঁচিয়ে একটি জারুল গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। কপাল থেকে ঘাম সরাতে সরাতে তাকায় সামনে।

ঝাঁ ঝাঁ রোদ। গত মাঘের শেষে কিঞ্চিৎ বৃষ্টি হয়েছিল। সেই শেষ। এরপর ফাগুন চৈত্র, বোশেখ জ্যৈষ্ঠ গেল এখনো বৃষ্টির দেখা নেই। বোশেখের শুরুতে আকাশ দুএকবার চোখ গরম করলেও তেমন কিছু বর্ষণ হয়নি। ফলে বোরো ওঠার পর এখনো কেউ আমন রুইতে পারেনি। এদিকে ডিপ-এর পানির খরচাও বেড়ে গেছে। যাদের জমি আছে তারাও একটু রয়ে সয়ে জমির কাজে হাত দিতে চাচ্ছে। ফলে সাহেবালীর মতো অনেক কামলাই বসে আছে এখন। যদিও তার অবস্থা আগে এতো খারাপ ছিল না। নানা কারণে মহাজনের কাছে জমি বন্ধক দিয়ে সে জমি আর ছাড়াতে পারেনি। এখন সম্বল এ ভিটেটুকু। সেটিও হয়তো ভবিষ্যতের চোরাবালিতে একদিন হারিয়ে যাবে। ভাবতে ভাবতে বুকে চাপ অনুভব করে সে।
এ সময় বাড়ির উত্তর দিক থেকে শিশুদের সম্মিলিত চিৎকার শোনা যায়। নানা কিছু ভাবতে ভাবতে একটু ঝিমুনি মতো এসেছিল। চোখ মেলে তাকায়।
তার ঘরের লাগোয়া ইদ্রিস আলীর ঘর। ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে ইদ্রিস। জেলা সদরে এক বিস্কুট ফ্যাক্টরির সুপারভাইজর। ফ্যাক্টরিতে বেতন ভাতা বাড়ানোর জন্য আন্দোলন হয়েছিল। মালিকের আবার ব্যাংকের দেনা। সেটি শোধ হয়নি নাকি হয়েছে তেমনটাই বলা হয়েছিল তাদের। কিন্তু হঠাৎ বিনা নোটিশে মালিক পক্ষ লে-অফের নোটিশ দিয়ে সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। কাজ হারিয়ে বাড়িতে এসে ইদ্রিস বিয়ে করে বসে। এখন শ্বশুড়ের ঘাড়ে সব দায়িত্ব চাপিয়ে নিজে ধোয়া শার্ট-লুঙ্গি পরে বাজারে তাস পিটিয়ে সময় কাটায়।
এগিয়ে আসে। বলে, ও মেয়া ভাই, গুড়াগাড়ায় অত চেল্লাপাল্লা করে কেনে, বাড়িত কী মুরুব্বি নাই?
ইদ্রিসের দেখাদেখি সাহেবালীও এগোয়। কাছে আসতে বোঝা গেল ব্যাপারটি। আশপাশে ঝোপঝাড়। জমির সীমানার দিকে, গাছের ছায়ার নিচে ধানখেতে জায়গায় জায়গায় ইঁদুরের গর্ত। সেখান থেকেই সাপটি বেরিয়েছে। সাপের ফনার পেছনে এবং গলার কাছে কালো কালো ছোপ। জাত কেউটে। গর্তের কাছে গিয়ে ইদ্রিস খেয়াল করে ভেতরে, অন্ধকারে ডিমের মতো কিছু রয়েছে। চেঁচিয়ে ওঠে ইদ্রিস, খবরদার, ভেতরে ছানা পোনাও আছে মনে হসসে। সা-ব-ধা-ন।
তার সতর্ক হাঁকডাকে ছেলেপেলের দল যেন আরো জড়োসড়ো হয়ে যায়।
রোদ লেগে মা-কেউটের ধূসর কালো শরীর চকচক করছে। জমিতে নেমে ফোঁস ফোঁস করছে সেটি। সম্ভবত পালিয়েই যেত ওটি। তবে চারপাশে মানুষগুলোর নড়াচড়ায় যেন নিজের বিপদ টের পেয়েছে। ফলে আত্মরক্ষার চেষ্টায় বারবার ফণা তুলে সবাইকে ভয় দেখানোর প্রবল চেষ্টা করছে সেটি।
ছেলের দল ততক্ষণে দূরে সরে গেছে। কিছুদিন আগেই ধান কাটা হয়েছে। জমি এখন খোলা, পড়ে আছে। খোলা জায়গা পেয়ে মহাআনন্দে শিশুর দল হা-ডু-ডু খেলছিল। ভাগ্য ভালো কাউকে কামড়ায়নি।
সাহেবালী দৌড়ে ঘরে যায়। নূরজাহানকে দেখতে না পেয়ে বারান্দার লাকড়ির স্তুপ থেকে দ্রত বড় একটি লাকড়ি বেছে নেয়। তারপর দৌড়ে নেমে আসে নিচে।
রোদের তাপে জমিতে পা দেয়া যায় না। জমিতে নেমে লাকড়ি হাতে সাবধানে কেউটেটির চারদিক এক পাক ঘুরে নিল সে। ভাল করে বুঝে নেয় তার অবস্থান। এর আগেও বহুবার সাপের মুখোমুখি হয়েছে সাহেবালী । তবে সেগুলোর অধিকাংশই ঢোঁড়া জাতীয়। তার কোনটিই এটার মতো নয়।
কেউটের জিহ্বাটি ঘনঘন বের হচ্ছে, ঢুকছে। স্পষ্টই সাপটি উত্তেজিত। বাবা বলতেন, ‘বাপধন, সাপ তোকে ভয় না দেখালে যেমনটি সে চায়, তেমনি তাকে যাতি দিও।’ কিন্তু সাপটি এখানে থাকলে সবাইকে কামড় দিবে। সেটি সাহেবালী চায় না। তার বাচ্চাটি ঘরের পেছনে, রাঁধাবাড়ার জায়গায় এককোণে শুয়ে থাকে। তার আশে পাশে এরকম বিষধর প্রাণী থাকা ঠিক নয়।
ইদ্রিস কোথা থেকে একটা মাছ ধরার বর্শা নিয়ে এসেছে। তবে তার নিজের সাহস হয় না। সেটি বাড়িয়ে ধরে সাহেবালীর দিকে। হাতের লাকড়িটি ফেলে সাহেবালী সেটিই শক্ত করে ধরে। সরীসৃপটি সরসর করে গর্তের দিকে এগোয়।
সাহেবালীও সুযোগ খোঁজে। এটিকে পালাতে দেওয়া যাবে না। ইদ্রিসকে ইশারা করে সে। এবরো-খেবড়ো শুষ্ক জমিতে, গর্তগুলোর চারপাশে ঝুরঝুরে মাটির স্তুপ। ইদ্রিস একমুঠো মাটি নিয়ে পলায়নপর প্রাণীটির মুখের দিকে ছুঁড়ে দেয়। সে ফাঁকে তার হাতের বর্শাটি গেঁথে ফেলল কেউটের মাথার পেছন দিক। বিদ্ধ হয়ে বেচারি সরীসৃপটির লেজ এক ঝটকায় শূন্যে উঠে জমির গায়ে আছড়ে পড়ল। আরও কয়েকবার সেটিকে বর্শায় গাঁথে সাহেবালী। সাপটি নিস্পন্দ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে। কিছুক্ষণ নিচু হয়ে হাঁটুতে হাত রেখে দম নেয় সে। এরপর মৃত সাপটিকে বর্শাবিদ্ধ অবস্থায় শূন্যে তুলে ধরে।
প্রায় চার হাত লম্বা জাত কেউটে। রোদ ঠিকরে পড়ে তার চকচকে শরীরে। কিছুটা দূরে একটি বড় গর্তে সাপটিকে ফেলে আসে। সেই সাথে গর্ত খুঁড়ে ভেতরের ডিম বের করে আনে। ডিম ভেঙে কয়েকটি সাপের ছানা উকিঁঝুঁকি দিচ্ছিল। সেগুলোও কোদালের আঘাতে শেষ করে। ছেলের দল এবার দূরে দাঁড়িয়ে হৈ হৈ করে ওঠে। ইদ্রিস পেছন ফিরে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে কড়া ধমক কষালো তাদের। তারপর সাহেবালীর দিকে ফিরে বলে, সব শ্যাষ। আর মারতি হবে না।
সাহেবালী ভাঙা খোলসে সাপের ছানাগুলোর থেঁতলানো শরীরগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর হাতের কোদালটি ছুঁড়ে ফেলে একদিকে।

২.

ঘরে ঢুকে সাহেবালী দেখতে পায়, নুরজাহান শুয়ে আছে। মাটিতে চাটাই বিছিয়ে শুয়ে আছে। বাচ্চাটি ঘুমুচ্ছে পাশে। বোধহয় দুধ খাওয়ানো হয়ে গেছে। স্বামীকে দেখে উঠে বসে। সাহেবালী কোমরের গামছাটি খুলে তার ঘামে ভেজা উদোম শরীর মুছে নেয়। তারপর ধপ্ করে বসে পড়ে চাটাইয়ে।
নুরজাহানের কণ্ঠ এখন অনেকটাই নরম। বলে, বায়রে ছাওয়ালগুলার চেল্লাচেল্লি শুনতে পালাম। কী হইয়েছেলো গো?
সাহেবালী বিরক্তির সাথে বলে, কিছু নয়, একটা সাপ। রদের তাপ সয্যি করতে পারেনি, বেরিয়ে এইয়েছেলো। মেইরে ফেলেছি। বলে সে চাটাইয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে দুহাত মেলে দেয় দুদিক।
বড় সাপ? জানতে চায় নূরজাহান।
হ, বড় সাপই তো। জাত কেউটা। আবার ছানাপোনাও ছিল। হাতপা টানটান করতে করতে বলে সাহেবালী।
কন কী ? নূরজাহানের এবার নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।
সাহেবালী কথা বলে না। ঘরের কোণে রাখা পানির কলসিটির দিকে হাতের ইশারা করে। পানি খাবে।
নুরজাহান স্বামীকে পানি এনে দিতে দিতে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, শুইনেছি, না কামড়ালে সাপ মারা নাকি ঠিক না।
তা জানিনে, যদি তোরে কামড়াতো, তোর ছাওয়ালরে কামড়াতো, তহন যাতি কোনে? স্ত্রীর ওপর বিরক্ত হয় সাহেবালী। তবে সাপের বাচ্চাগুলোকে মারতে একটু খারাপ লাগছিল তার। কিন্তু জাত কেউটের বংশ রাখতে নেই, এটা সে জানে।
সাহেবালী তৃপ্তির সাথে পানি খায়। এদিকে কলসিটি প্রায় খালি। পানি আনতে যেতে হবে চেয়ারম্যান বাড়ি। এ কাজটি অবশ্য নূরজাহানই করে থাকে। সে তাকায় স্ত্রীর দিকে। কিছুক্ষণ আগে বাচ্চাকে খাইয়েছে। ফলে নুরজাহানের বুকের একপাশ উন্মুক্ত। তার পুষ্ট স্তন-বোঁটা থেকে তখনও কিছুটা দুধ নিঃসৃত হচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে সাহেবালীর কণ্ঠ নরম, ঘন হয়ে আসে। অনুচ্চ কন্ঠে বলে, তখন বকেছি বলে কষ্ট পাছিস?
নুরজাহানের বুকের আঁচলের দিকে খেয়াল নেই। বলে, আর ঢং করতি হবে না। হাটে যাতি হবে। এ-বেলা খাবার কিছু নাই। সাহেবালী নুরজাহানকে দেখে। বাচ্চা হওয়ার পর তার রূপ যেন আরো খুলেছে। আপত্তি সত্বেও স্ত্রীকে নিজের দিকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে সে।
হাটে সবগুলো লাউ বিক্রি হয়ে যায় সাহেবালীর। তাতে খোরাকির চাল হলো। তবে ফজু মাঝির কাছ থেকে কুচো চিংড়ি নিল ধারে। মাছ দেওয়ার আগে ফজু মাঝি মনে করিয়ে দিল, তোমার কাছে অহনও গত হাটের একশ আট ট্যাকা পাই, ঢালীর পো। সাহেবালী পলিথিনে মাছ বেঁধে নিতে নিতে বলে, মনে আছে গো। অত কতি হবে না। সামনের হাটে পায়া যাবা মিয়া।
রোদ কিছুটা মিইয়ে এসেছে। আকাশে মেঘের কিঞ্চিৎ আনাগোনা শুরু হয়েছে। দুদিন আগেও একইভাবে আকাশ মেঘলা হয়ে উঠেছিল। তবে বৃষ্টি হয়নি। পুরোমাস ধরে এভাবেই চলছে। হাটের লোকজন নিস্পৃহ চোখে আকাশ দেখে।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত হয়ে যায়। বাজার শেষে একটু কাজেরও তদ্বির করে এসেছে সাহেবালী। হানিফ তালুকদার এ সপ্তাহেই জমির কাজে হাত দেবে। আমন রোপনের এখনই সময়। তার কামলা লাগবে অনেক। সাহেবালী শুধু নিজের জন্যও নয়, ইদ্রিস, ইদ্রিসের এক বেকার শ্যালক সবার কথাই বলে এসেছে। সেসব শেষ করতে করতেই দেরি হয়ে যায় তার। বিকেলের দেখা হালকা মেঘ ততক্ষণে জমাট, গাঢ় পাথুরে রঙ ধারণ করেছে। থেকে থেকে বাতাস শুরু হয়েছে।
ঘরের সামনে উঠোনে কুপি হাতে দাঁড়িয়ে নুরজাহান। এ গ্রামে অনেকের ঘরেই এখন বৈদ্যুতিক বাতি। কারো কারো ঘরে সোলার বাতিও রয়েছে। সাহেবালী এর কোনটাই আনতে পারে নি। বাতাসে কুপির সলতের আলো এদিক ওদিক সরে যাচ্ছে। সে আলোয় নূরজাহানকে কেমন অপার্থিব দেখায়।
দেরি অলো কেনে? নূরজাহান প্রশ্ন করে। সাহেবালী ফিরে আসায় একই সাথে স্বস্তিবোধ করে সে।
কাজ ছেল। ছোট করে উত্তর দেয় সাহেবালী। স্ত্রীলোকের সব কথার উত্তর দিতে নেই, ভাবে সে।
অন্ধকারে, কালো আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে নূরজাহান বলে, ভাল বৃষ্টি হবি মনে হতিছে। ওই যে, দূরে বাজ চমকায় দ্যাখো।
সত্যিই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আকাশ কালো কুচকুচে। মেঘ এখন দলেবলে আরো ভারি হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছে সবাই। বৃষ্টি হলে মাটি নরম হবে। তাতে চাষবাসে, চারারোপণে সুবিধে। বসে থাকা মানুষগুলো তখন কাজ পাবে। আশেপাশের ঘরগুলো থেকে এর মধ্যে অনেকে উঠোনে নেমে এসেছে।
স্ত্রীর শুকনো মুখটির দিকে তাকিয়ে সাহেবালী হঠাৎ বলে, এবার ভাল ধান হলি পরে একটা নাকফুল গড়িয়ে দেবনি তোকে।
নুরজাহান স্বামীর হাত থেকে হাটের জিনিষপত্রগুলো নেয়। নিতে নিতে বলে, অয়েছে, অত চ্যাংরামি করতি হবি না। এবার ঘরে চলো দিকিন। স্বামীর দিকে কপট রাগের চোখে তাকায় নূরজাহান। বিয়ের সময় সাহেবালী তাকে একটি সোনার হার আর হাতের দুটো বালা গড়িয়ে দিয়েছিল। গত বছর সেগুলো বিক্রি করে মহাজনের ধার শোধ করেছিল সাহেবালী। বিয়ের জিনিস, এভাবে হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় ভারি কষ্ট হয়েছিল নূরজাহানের।
কুপির আলোয় যত্ন করে রাঁধে নুরজাহান। লাউ দিয়ে চিংড়ি কুচোর ঝোল।
দুই বাহুর পেছনে মাথা রেখে চাটাইয়ে শুয়ে সাহেবালী স্ত্রীর রান্না শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। গরম ভাতের গন্ধ নাকে আসছে। বিকেলে হাটে ডালপুরী আর চা খেয়েছিল। তাও হজম হয়ে গেছে বহু আগে। দুপুরের ক্ষিদে ফিরে এসেছে আবার।
নুরজাহান চুলোয় ফুটতে থাকা ডালে বাগাড় দেয়। তাতে ঘরে পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ঘরের ভাঙা জানালা দিয়ে হু হু বাতাস ঢুকছে এখন ঘরে। দমকা বাতাসে কুপি নিভে আসছে। নুরজাহান বিরক্ত হয়ে উঠল, বৃষ্টি অলে হবে, মরার বাতাস ক্যানে?
বাতাস যেন হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে। ঘরের চালা নড়তে থাকে। বাইরে ইদ্রিসের চিৎকার শোনা যায়, আসমানের অবস্থা ভাল না সাহেব ভাই। তুফান আসবি মনে হচ্ছে। সা-ব-ধা-ন।
এসময় কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাতাসের একটা প্রবল ঝাপটা নেমে আসে পূব দিক দিয়ে। তাতে ঘরের জীর্ণ চালা মুহূর্তেই উড়ে যায়। মড় মড় করে ঘরের পাশের জারুল গাছটি ভেঙে পড়ে নিচে। কিছু শুকনো পাতা উন্মাদের মতো শূন্যে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে সাহেবালীর উদোম ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। নূরজাহানের আর্ত চিৎকারটুকু শুধু কানে আসে তার।

৩.

ঝড় তুমুল শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়েছে চারধারে। সাহেবালীর চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেছে আগেই। ছিটকে যেতে যেতে সে শুধু ঝাপসা চোখে দেখতে পায় – প্রবল বাতাসে, ঝড়ের ঝাপটা ও গাছের পাতার যুগল নৃত্যের ভেতর কিছু সরীসৃপের ছায়া, ভিটের এককোণে পড়ে থাকা তাদের শিশুপুত্রকে ঘিরে ফেলেছে।

 

Share Now শেয়ার করুন