শিল্পকলায় নারী >> ইউরোপে ও ভারতবর্ষে >> ভূমিকা >> চিত্রকলা

0
301

শিল্পকলায় নারী >> ইউরোপে ও ভারতবর্ষে

প্রথম অধ্যায়
আদিম যুগ

[এক] ভূমিকা

সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার তুলনায় শিল্পকলায় নারীর উপস্থিতি সবচেয়ে প্রাচীন। প্রাগৈতিহাসিক যুগে ভাস্কর্যের রূপে নারীকে যে দেখানো হয়েছে তার দৃষ্টান্ত পাওয়া গিয়েছে অষ্ট্রিয়ার উইলেনডর্ফে খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০০ অব্দে ভেনাস অফ টান টান নামে পরিচিত মূর্তি আবিষ্কারে। একই প্রকৃতির যে মাতৃকামূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে চেকোস্লোভাকিয়ার মোরাভিয়া এবং জার্মানির শ্লেকলিঙ্গেন অঞ্চলে সেগুলির বয়স আরো প্রাচীন। সিন্ধু নদ সভ্যতায় পোড়ামাটির তৈরি একই ধরনের নারী মূর্তি প্রত্নতত্ত্ববিদরা খনন করে পেয়েছেন। বিভিন্ন মহাদেশে প্রাচীন সভ্যতার সময়কালে সৃষ্ট শিল্পকলায় (ভাষ্কর্য ও চিত্রকলা) নারীকে বিষয় হিসেবে দেখা যায় বিভিন্ন ভূমিকায়। ইতিহাসের বিবর্তনে শিল্পকলায় বিষয় হিসেবে নারীর ভূমিকার অনেক নিদর্শন যে শুধু দেখা গিয়েছে তাই নয়, তার ক্রমবর্ধমান সংখ্যা বৃদ্ধিও চোখে পড়ার মতো। প্রাচীনকাল থেকে এবং ব্যাপকহারে উপস্থিতি সত্ত্বেও শিল্পকলায় নারীর ভূমিকা যে তেমন বিশদভাবে আলোচিত ও বিশ্লেষিত হয়নি, সেই বিষয়টি বেশ বিস্ময়কর। তুলনায় সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে শুধু বিশদ আলোচনা হয়নি তৈরি হয়েছে একাধিক তত্ত্বও। নিকট অতীতে এবং বর্তমানে শিল্পকলায় নারীর ভূমিকা নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে সেখানে হয় সাহিত্য অথবা চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত নারী সম্পর্কিত তত্ত্ব ও ধারনার প্রয়োগই দেখা যায় বেশী। নারীবাদী আন্দোলন গত তিন দশকে অনেক অগ্রসর হয়েছে এবং নারী অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সেই আন্দোলনের সফলতায় দেশভেদে তারতম্য থাকলেও তা উল্লেযোগ্য। এই প্রেক্ষিতে ভাষ্কর্য ও চিত্রকলার মতো প্রাচীনতম শিল্প মাধ্যমে শিল্পকলার নিজস্ব তত্ত্ব তৈরির শ্লথ গতি ও অপ্রতুলতা ভাবনার বিষয়। শিল্পকলার ইতিহাসে এই ক্ষেত্রে যে প্রায় শূন্যতা ও নিরবতা দেখা যায় তাতে মনে হতে পারে শিল্পকলায় নারীর প্রতিনিধিত্ব স্বাভাবিকই বলেই, যার জন্য এই প্রসঙ্গে সমালোচনাধর্মী লেখা তেমন হয়নি। অর্থাৎ শিল্পকলায় নারীর ভূমিকা বা রিপ্রেজেন্টেশন অতীত থেকেই সর্বজনগৃহীত ও সর্বসম্মত একটি বিষয় হয়ে গিয়েছে যার জন্য এটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের দাবী রাখেনি। এই বিশ্বাস অবশ্য নারীবাদী লেখক ও সমালোচকদের চিন্তা-ভাবনা আচ্ছন্ন করতে পারেনি যার জন্য এর বিরুদ্ধে মাঝে-মাঝেই প্রতিবাদের স্বর শোনা গিয়েছে। কিন্তু এই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর যেমন হাই অকটেভে হওয়া সমীচিন তা প্রায়ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। নারীবাদী আন্দোলন প্রজেক্ট হিসেবে যখন পাশ্চাত্যে উত্তর-নারীবাদী আন্দোলনে পৌঁছেছে সেই সময় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, বিশেষ করে শিল্পকলায় নারীর ভূমিকা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে সমালোচনামূলক লেখা অপ্রাসঙ্গিক ও কিছুটা পুরনো মনে হতে পারে। কিন্তু যেহেতু এই ক্ষেত্রে বিশদ আলোচনার বিষয়টি অনেকেরই গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেনি এবং এবং এখনও করে বলে মনে হয় না, সেই বিবেচনা থেকেই বর্তমান লেখাটির অবতারণা। এই লেখা যে সময়কালকে ধারণ করেছে তার ব্যপ্তি প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মধ্যযুগ। যেহেতু জেন্ডার বা নারী-পুরুষের সম্পর্ক এবং মেয়েদের যৌনতার পরিচয় প্রাচীনকাল থেকে দেখা যায় এবং তার প্রভাব বর্তমানেও প্রতিফলিত হয়েছে সেই জন্য এই সময়কালের বিশ্লেষণ কেবল একাডেমিক উদ্দেশ্য পূরণ করে না, বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতেও তা প্রাসঙ্গিক।

[দুই] শিল্পকলায় নারীর ভূমিকা

শিল্পকলায় নারীর ভূমিকা দেখা যায় দুই স্তরে। প্রথমত, শিল্পকলার বিষয় হিসেবে যেখানে তাদের ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন রূপে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য। দ্বিতীয়ত, শিল্পকলায় নির্মাতা হিসাবে নারীর ভূমিকা। প্রথমটির ইতিহাস দ্বিতীয়টির তুলনায় অনেক প্রাচীন এবং শিল্পকর্মের সংখ্যার দিক দিয়ে অনেক বেশী। শিল্পকলার নির্মাতা হিসেবে নারী অনেক আগে অবতীর্ণ হলেও শিল্প-ইতিহাসে তার স্বীকৃতি পাওয়া গিয়েছে সম্প্রতি, কারো কারো মতে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। শিল্পকলায় বিষয় হিসেবে নারীকে ব্যবহার এবং নির্মাতা হিসেবে তাদের আবির্ভাবের এবং স্বীকৃতি লাভে বিলম্ব, উভয়ের পেছনেই রয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কারণ। আলোচনায় দেখা যাবে যে, পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীর অবস্থান স্বীকৃতিহীন হলেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল আদিম যুগ থেকেই। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনে এই ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও নারী যে শিল্পকলার নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে পুরুষের তুলনায় অনেক পরে তার পেছনেও রয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক কারণ। এই ঐতিহাসিক তথ্য থেকে বলতে হয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ শিল্পকলায় বিষয় হিসেবে নারীকে প্রাগৈতিহাসিক যুগে ব্যবহার করলেও তাকে শিল্পের নির্মাতা হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অবশ্য প্রাগৈতিহাসিক এবং প্রাচীন, এমনকি পরবর্তী সময়ে বহুদিন পর্যন্ত নারীর শিল্পকলা চর্চা ছিল গার্হস্থ্য জীবনের কার্যক্রমের অংশ। যেমন, কাঁথা বা লেপ সেলাই, এমব্রয়ডারি বা সূচিকর্ম ইত্যাদি। যখন নারী তাদের প্রতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিধি-নিষেধ, বৈষম্য ও বিদ্বেষ অতিক্রম করে নির্মাতা হয়েছে তার সফলতাকে দেখা হয়েছে লিঙ্গ নিরপেক্ষতার দৃষ্টিতে, নারী হিসেবে নয়। একজন নারী শিল্পীকে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়েছে শিল্পী হিসেবে, নারী হিসেবে নয়। এর ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় দিকই রয়েছে। ইতবাচক দিকটি হল এই যে, ‘নারী’ বলে পৃথক মানদণ্ডে নারী শিল্পীর সৃষ্টিকে দেখা হয়নি। এই দৃষ্টিভঙ্গির নেতিবাচক দিক হল নারী শিল্পীকে পৃথক কোনো সংজ্ঞায় বা পরিচিতিতে স্বীকৃতি জানানোর অনীহা। নারী শিল্পীদের কাছে প্রথম বিষয়টি (ইতিবাচক) অবশ্য শ্লাঘার বিষয় পক্ষপাতহীনতার জন্য। দ্বিতীয় বিবেচনায় (নেতিবাচক) তাদের অনেককেই ক্ষুব্ধ হতে হয়েছে এই জন্য যে, নারীর ভিন্ন দৃষ্টি নিয়ে তারা যে শিল্প সৃষ্টি করছে তার স্বীকৃতি নেই এই জেন্ডার-নিরপেক্ষ অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে। একজন শিল্পনির্মাতা প্রথমত বিশেষ লিঙ্গের সদস্য এবং পরবর্তীতে শিল্পী, নাকি এর উল্টোটা? এই টানাপোড়নে বা ডাইলেমার ওপরে অনেকে উঠতে পারেননি। একজন কট্টর নারীবাদী যখন বলবেন শিল্পী প্রথমে নারী এবং পরে শিল্পী, তার উত্তরে প্রতিষ্ঠিত নারীশিল্পী আপত্তি করে বলতে পারেন যে তিনি প্রথমত শিল্পী এবং পরবর্তী বিবেচনায় নারী। নারী-শিল্পীর হাইফেনেটেড পরিচিতি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে তো হবেই না, সেভাবে তাকে দেখা হলে মনে হবে অবমাননাকর।
শিল্পকলার বিষয় হিসেবে নারীর ভূমিকা লিখতে গিয়ে নারীশিল্পীদের সৃষ্টির কথা অবশ্যম্ভাবীভাবে এসে যায়। কিন্তু যেহেতু তারা শিল্প ইতিহাসে অনেক পরে পরিচিত মাধ্যমে (ভাস্কর্য, চিত্রকলা) কাজ করেছে এবং আবিষ্কৃত হয়েছে সেই কারণে লেখাটির প্রথম অংশে বিষয়ের আলোচনায় কেবল পুরুষ শিল্পীদের কাজই এই লেখায় উল্লেখ করা হবে। এর ফলে প্রচলিত সামাজিক-সাংষ্কৃতিক রীতির ভিত্তিতে পুরষের দৃষ্টিতে দেখা এবং শিল্পকলায় নারীকে বিভিন্ন ভূমিকায় প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। এই লেখার পরবর্তী অংশে যখন নারীকে শিল্পীর ভূমিকায় দেখিয়ে আলোচনা করা হবে সেই অংশে তাদের শিল্পসৃষ্টির বিষয় আসবে এবং তারা শিল্পকলায় নারীকে কীভাবে প্রতিফিলিত করেছে তার বিশ্লেষণ থাকবে। অর্থাৎ বিষয়ের আলোচনা নারী ও পুরুষ শিল্পীদের ক্ষেত্রে এক সঙ্গে নয়, আলোচনার সুবিধার জন্য পৃথকভাবেই করা হবে এবং তা এই কারণেও যে শিল্পী হিসেবে নারীর আবির্ভাব হয়েছে দেরীতে এবং তারা স্বীকৃতি পেয়েছে আরো পরে। আলোচনায় এই দুইয়ের মধ্যে পৃথকীকরণ থাকলেও উভয়ের তুলনা করা হবে প্রথম থেকেই। এই জন্য লেখার দুটি অংশের আলোচনায় বিষয় হিসেবে নারী এক এবং অভিন্নরূপেই দেখা দেবে। যদি পুরুষ ও নারী শিল্পীদের শিল্পচর্চা একই সঙ্গে, বিশেষ করে একই মাত্রায় শুরু হতো তাহলে বিষয় নিয়ে এই আলোচনা এক সঙ্গে করা যেত।
উপরে উল্লিখিত দুটি প্রেক্ষিতে শিল্পকলায় নারীর ভূমিকার আলোচনায় ইতিহাসের পর্যালোচনা অপরিহার্য। ইতিহাসেরই অনুষঙ্গে অথবা পাশাপাশি ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত নিয়ে আলোচনা (শিল্পকলার নিদর্শন) এই উদ্দেশ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের পর্যালোচনা ও ব্যবহারিক দৃষ্টান্তের উল্লেখ কখনো পাশাপাশি থাকবে, আবার কখনো তাদের মধ্যে ওভারল্যাপ এসে যেতে পারে। যেমন, ইতিহাসের পর্যালোচনাক্রমে শিল্পকর্মের ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত দেওয়া।
শিল্পকলায় নারীর ভূমিকা ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে সাহিত্যিক, দার্শনিক, অথবা নির্দিষ্ট শিল্পভিত্তিক তত্ত্ব ও ধারণাসমূহ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইসব তত্ত্ব ও ধারণাসমূহ নারীবাদী আন্দোলন সম্পর্কিত স্টাডিজ অর্থাৎ জ্ঞানভাণ্ডার থেকে গ্রহণ করে প্রয়োগ করা হয়েছে, যার উল্লেখ রয়েছে এই লেখার প্রথমে। বিশেষ করে সাহিত্যপাঠ ও চলচ্চিত্র বিশ্লেষণে যেসব নারীবাদী তত্ত্ব তৈরি হয়েছে শিল্পকলায় নারীর ভূমিকায় সেগুলির বহুল প্রয়োগ দেখা যায় প্রায় ক্ষেত্রে। এই সব নারীবাদী তত্ত্বের পেছনে রয়েছে ফ্রয়েডীয় মনস্তাত্ত্বিক, গঠনবাদী এবং উত্তর-গঠনবাদী দার্শনিক চিন্তা ও ভাবনা, এমনকি ভাষাতত্ত্ব। শিল্পকলায় নারীর ভূমিকার বিশ্লেষণে এককভাবে নির্দিষ্ট অর্থাৎ শিল্পকেন্দ্রিক নারীবাদী তত্ত্ব এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে তৈরি হয়নি । যা হয়েছে সে-সব শিল্পের অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রচলিত ও ব্যবহৃত তত্ত্বের সমন্বিত বা আংশিক প্রয়োগ। এই প্রসঙ্গ আলোচনার শেষ অংশে স্থান পাবে। এখানে যা প্রাসঙ্গিক তা হলো শিল্পকলায় নারীর ভূমিকার আলোচনায় শিল্প-ইতিহাসের পর্যালোচনা যথেষ্ট নয়, তত্ত্ব প্রয়োগেরও প্রয়োজন রয়েছে, সেই বিষয়টি মনে রাখা।

[তিন] শিল্পে বিষয় হিসাবে নারী
প্রাগৈতিহাসিক যুগ

বিষয় হিসাবে নারীকে দেখা যায় প্রাগৈতিহাসিক যুগের শিল্পকর্মে, যার উল্লেখ আগেই করা হয়েছে। এর একটি প্রাচীন নির্দশন খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০০ থেকে ২৫০০০ অব্দে তৈরি মাতৃকামূর্তি। এটি আবিষ্কৃত হয় অস্ট্রিয়ার উইলেনডর্ফ এলাকায় যার জন্য এর নাম হয়েছে উইলেনডর্ফ নারী। অবশ্য ভেনাস অফ টান টান নামটি অধিক জনপ্রিয়। ক্ষুদ্রাকার এই নারী মূর্তি (৪.৫ ইঞ্চি) চুনাপাথরে তৈরি এবং এর গায়ে উঠে যাওয়া রঙের নির্দশন রয়েছে। মূর্তিটির প্রধান বৈশিষ্ট্য এর বৃহদাকার দুটি স্তন, স্ফীত উদর এবং দৃশ্যমান যোনিমুখ। দেহের এসব অংশের তুলনায় মূর্তিটির হাত এবং পা খুবই ছোট এবং প্রায় অদৃশ্য। এই মূর্তির আগে এবং পরে একই শ্রেণির যেসব নারীমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলিরও স্তন, উদর এবং নিতম্বকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। প্রত্যেকটি নারীমূর্তিতেই স্পষ্ট করে দেখানো হয়েছে জননেন্দ্রীয়। ফ্রান্সের লেসপুলেতে আবিষ্কৃত নারী মূর্তিটি জ্যামিতিক বৃত্ত, রেখা এবং খোদাই করা গর্তের সমন্বয়ে প্রায় বিমূর্ত দেখায়। অপরদিকে চেক রিপাবলিকের ডোলনিতে পাওয়া নারী মূর্তিটি কেবল দেহের অংশ মাত্র (স্তন) নিয়ে তৈরি। ফ্রান্সের দোরদেঁনোতে আবিষ্কৃত নারীমূর্তি নির্মিত হয়েছে উদর এবং জঙ্ঘান সমন্বয়ে। একই এলাকায় প্রস্তরখণ্ডের ওপর নারীর শরীরের নিম্নাঙ্গে যোনিমুখ স্পষ্টভাবে খোদাই করে দেখানো হয়েছে। ইতালির চিয়োজ্জা এলাকায় খ্রিষ্টপূর্ব আড়াই হাজার অব্দে যে নারীমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে সেটির পা নেই, কেবল মুখাবয়বহীন মস্তক দেখানো হয়েছে পুরুষ লিঙ্গের আকারে। এইসব মূর্তি প্রসঙ্গে শিল্প-ঐতিহাসিকরা মন্তব্য করেছেন যে, শিল্প এবং যৌনতা শিল্পকলার সূচনাপর্বে বেশ স্পষ্টভাবে পরস্পর অন্বিষ্ট ছিল (হিউ হনার এবং জন ফ্লেমিং, এ ওয়ার্ল্ড হিষ্ট্রি অফ আর্ট ১৯৮৪)। প্রাগৈতিহাসিক যুগের এই সব পূর্ণাঙ্গ অথবা অর্ধ বিমূর্ত কিংবা আংশিক মূর্তি তৈরির উদ্দেশ্য সম্বন্ধে মনে করা হয়েছে এগুলির ভূমিকা ছিল উর্বরতার প্রতীক হিসেবে অথবা ম্যাজিক ক্ষমতা বিশিষ্ট কাল্টরূপে ব্যবহার। যেহেতু প্রাগৈতিহাসিক যুগে ধর্ম বিশদ ছিল না এবং প্রাকৃতিক শক্তি বা অন্য দেব-দেবীর উপাসনার প্রচলন হয়নি সেই জন্য এই সব নারীমূর্তি উপাসনার জন্য তৈরি হয়েছে বলে মনে করা যায় না। এগুলির ভূমিকা ছিল খুব সম্ভবত সামাজিক (উর্বরতার প্রতীক হিসেবে সম্ভ্রম সৃষ্টিকারী কাল্ট বা সামষ্টিক বিশ্বাস) অথবা অর্থনৈতিক (ম্যাজিক শক্তিসম্পন্ন বস্তু হিসেবে শ্রদ্ধাকারীদের ক্ষমতা প্রদান)। উভয় ক্ষেত্রেই একধরনের মুগ্ধতা ও প্রশংসা এবং সম্ভ্রম প্রদর্শনের প্রণোদনা কাজ করেছে। কিন্তু এই প্রণোদনা লাভের জন্য নারী মূর্তিতে যৌনতার প্রতীক যে সব অঙ্গ-প্রতঙ্গ সেগুলিকে প্রধান, অতিরঞ্জিত অথবা সুনির্দিষ্টভাবে প্রদর্শনের যৌক্তিকতা বোঝা যায় না। মনে হয় শিল্পীরা এবং যারা এই সব মূর্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সম্ভ্রম বোধ করেছে তাদের অবচেতনে সুপ্ত ছিল নারী দেহের যৌন আবেদন প্রত্যক্ষের অভিজ্ঞতা লাভের বাসনা। যৌনতা এবং শিল্পকর্ম এভাবে আদিম পর্বেই যে কার্যকর ছিল তার প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়েছে এই সব নগ্নিকা এবং কামোদ্দীপক মূর্তি। নারীকে প্রাগৈতিহাসিক যুগেই দেখা হয়েছে যৌনতার প্রতীক এবং যৌন আবেদন সৃষ্টির আধার হিসেবে, এই ধারণা পোষণ করেছেন অনেকে। কিন্তু যখন স্মরণ করা হয় যে, গুহাবাসী নর-নারী উলঙ্গই থাকত যার জন্য নারী দেহের সেই সব স্থান (স্তন, যোনী) যা পুরষের কাম উদ্রেক করে বলে মনে করা হয়, সেগুলির প্রতি “অসভ্য যুগে পুরুষের কাছে যৌনাবেদনের প্রতীক বলে মনে না হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। সুতরাং তখনকার শিল্পী নগ্নিকা নারীমূর্তি বা নারী মূর্তির ভগ্নাংশ যৌনাবেদনের ভিত্তিতে বা যৌন আবেদন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তৈরি করেছে একথা জোর দিয়ে বলা যায় না। হয়ত এই ধরনের মূর্তি ছিল তখনকার মানুষের কাছে উর্বরতার প্রতীক।

প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন ধর্ম বিশ্বাস সুস্পষ্টভাবে গড়ে ওঠেনি এবং উপাসনার নির্ধারিত আচারভিত্তিক কার্যক্রম তৈরি হয়নি তখন নারীমূর্তি মাতৃকা দেবী হিসেবে নির্মিত এবং পুজিত হয়েছে, এই বিশ্বাস এবং মত ভারতবর্ষে ঐতিহাসিক এবং শিল্পসমালোচকদের মধ্যে বেশ প্রচলিত। মধ্য প্রদেশের লাখাজোয়ার, খারোয়া, কাথাটিয়া, জাওরা এবং উড়িষ্যার সম্বলপুর ও সুন্দরগড় এলাকার গুহাচিত্রে পুরুষের সঙ্গে যে নারীমূর্তি দেখা যায় সেগুলি দেবী হিসেবে নির্মিত হয়েছে বলে অনেকের বিশ্বাস। নারী যেহেতু যৌন মিলনের সঙ্গী এবং সন্তানের জন্ম দেয়, সেই জন্য তাদের প্রতি প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে পুরুষের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত চিন্তা-ভাবনা ছিল এটা বোঝা যায় এই সব মূর্তির এবং গুহাচিত্রের প্রদত্ত ব্যাখ্যায়।

[চলবে]