হাসনাত শোয়েব | কবিতাগুচ্ছ

0
124

হাসনাত শোয়েবের কবিতা

দতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।
সুবর্ণ আদিত্য, সম্পাদক কবিতা বিভাগ, তীরন্দাজ, ঢাকা ১০ জানুয়ারি ২০২১

কবিতাগুচ্ছ

সন্তান প্রসবকালীন গান

এই পাহাড়ের নিচে যে দুপুর একা একা… বয়ে যাচ্ছো তুমিও। বাঁ কাঁধের ফেরেশতারা একে একে ভীড় করে এই পাহাড়ের ধারে। যারা একটু পরেই ফেটে পড়বে অট্টহাসিতে। তুমুল কোন নারীর যৌনজীবনের দিকে তুমিও ছুঁড়ে দেবে বর্শা। একটি তীর ক্রমশ ভেদ করে চলে যাচ্ছে অপার বর্ষা। এই তবে শেষ দিবসের গান? আজকের রাতটাই? তারপর কর্কটাক্রান্ত প্রতিটি ভোরের মৃত্যু হবে তোমাকে না জানিয়েই? আমি জানি, এইখানে ফলিত শরীরের নিচে বাসা বাঁধছে অবিশ্বাস। যারা প্রতিদিন একটু একটু করে জড়ো হচ্ছে। লিখছে কঠিন কোন শোকবার্তা। ভুল ঠিকানায় পোস্ট হয়ে যাওয়া সেইসব বার্তার আড়ালে ঘুমিয়ে মা কিংবা প্রেমিকারা। তাদের হাতে সদ্য ফোটা মৃত শিশু। সেটিও ভুলে পোস্ট হয়ে যাওয়া কারো নাম। তুমি নামের পাশে ঘুমন্ত টারবাইন। ক্রমশ ঘূর্ণায়মান এই দুপুর। সেও থাকুক সাক্ষী। তার ভেতর থেকে তোমাদের মৃত পিতারা। যারা দিবসের আগে হারিয়ে ফেলেছিল কোমর বন্ধনি। যাদের কবরের পাশে কখনো নামেনি রাত। এমনকি দিনও আসেনি কখনো।
আসেনি গতকাল, পরশু কিংবা তার পরেরদিনও। সেইসব দিনের পেছনে লেলিয়ে দেই অজস্র খরগোশ। যারা নিজস্ব সুরবাহারের আড়ালে লুকিয়ে রাখে যৌনজীবন। আর লুকিয়ে রাখে তীর ধনুক। তোমরা তাদের দাও অমরত্বের সুসংবাদ। সেই সুসংবাদ সমাচার পৌঁছে দেবে হলুদ বার্তাবাহকেরা। যারা নিশান উড়িয়ে চলে গেছে হেমন্তের বিকেলের দিকে। আসো তোমায় এবার বিকেল দেখাব। বিষাদে লেপ্টে থাকা বিকেল। শিবকুমারের সন্তুর পার করে যারা চলে গেছে,আর ফিরবে না‌। অথচ ফিরবে না জেনেও কত আয়োজন! দুপুরের পর ছিল কমলা উৎসব। ছিল উৎসব শেষে অতিথিদের বিদায়ে মন খারাপ হওয়ার পর্বও। তবুও তুমি শোনোনি, প্রসূতিদের যন্ত্রণা ও সন্তান প্রসবকালীন গান। বান্দিশ পেরুনোর আগেই যারা প্রাণত্যাগ করেছিলো তাদের কথাও।
কেবল তৃতীয় সুরের কাছে হাত পেতে বসেছিলে। অকূল হয়ে কেঁদেছিলে। ফিরিয়ে দিয়েছিলে যুদ্ধাহত ঘোড়াদের। যারা ফিরে এসেছিল বান্দিশের পথ‌ ধরে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে। তাদের তুমি শুশ্রূষা দাও। দাও লবণ ও লবঙ্গ। নাকের কাছে এনে ঘ্রাণ নাও। তবুও কি সে ভুলতে পারে বৃহস্পতিবার দুপুরের কথা? যার শরীরে কেবল যুদ্ধের দাগ, তুমুল ঘূর্ণিঝড় তার কাছে কেবলই বিপদ সংকেত। যেখানে সে হারিয়ে ফেলেছিল পিতৃপ্রদত্ত কোমর-বন্ধনিও। তুমি খুঁজে নাও, অসুখের যত নাম। কেবল নকল করা গানই তোমাদের বাঁচাতে পারে। এই ভাঙা রেডিও ‌তাই বারবার ফিরে আসে। আহতদের শুশ্রূষা হয়ে। প্রসূতিদের গান হয়ে। তোমার ভেতর‌‌ যারা কেবল ঝরে যাচ্ছে।

ফ্রেগরেন্স অফ ইয়াবা

রুম নাম্বার ৪৪৫, উড়িয়ে দাও তোমার মখমলে ফেরেশতা। পশমাবৃত উইকেন্ডের গায়ে ফ্রেগরেন্স অব ইয়াবা। তোমরা কেউ এগিয়ে এসে বিউগল তুলে নাও। বাজাও পরমগীত সলোমন। ছায়ার ভিতর মেরুন অন্ধকার। আর শিরার ভিতর সিরিঞ্জভর্তি রঙিন বিষাদ। ওহে ফেরেশতা, চোখে এবার কিছু ফ্রেগরেন্স জড়িয়ে নাও। শুয়ে পড়ো কোমল গান্ধর্বে।


জেরেমি, তুষার শুভ্র নায়িকাদের কসম। ফ্রেগরেন্স অব ইয়াবার দিন শেষে তোমরা বিষন্ন বোধ করবে।


নিদ্রাকুসুম তোমাদের দিনগুলা একা একা বয়ে যায় পাতাবাহার। কোথাও ইয়াবার ফুল হাতে অপেক্ষার ভালোবাসা। তুমি দেখো, ফ্রেগরেন্স অব ইয়াবার মৌসুম আবার ফিরছে। তার বুক জুড়ে ক্রুশ বিদ্ধ যীশুর যন্ত্রণা। চলো জেরিমি, মেতে উঠি গভীর মৌতাতে। গোপনে সাজিয়ে দেয় আফিমের বাগান। এখনি ফিরবে বোরিং কপি রাইটার।

কবিতাভাবনা

কবিতাকে বুঝার মতো বা ব্যাখ্যা করার মতো কিছু বলে আমি মনে করিনা। তবে এটা এমন কিছু যা অনেক্ষণ ধরে ভাবাবে, বারবার ফিরিয়ে আনবে তার কাছে।ওইটুকু করতে পারলেই আমার কাছে কবিতা মনে হয়। আমি অনেক দিন পর পর লিখি। যখন লিখি একটানা লিখি। হাঁ আনন্দ নিয়েই লিখি। যা মনে চায় লিখি। লেখা আমি খুব বেশি এডিটও করি না । লেখালেখিকে আমি কখনো চাপ হিসেবে নেই না। এমনকি আজ থেকে আমি আর কখনো লিখতে না পারলেও আমার কোনো আফসোস থাকবে না।

হাসনাত শোয়েব

মূলত কবি। ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামে জন্ম। সেখানেই বেড়ে ওঠা। পড়তে পড়তে কবিতার জগতে আসা। ২০১২ সাল থেকে কবিতার পথে যাত্রা। তখন থেকেই বিভিন্ন ম্যাগ এবং ওয়েবে কবিতা প্রকাশ। ২০১৫ সালে প্রথম কবিতার বই ‘সূর্যাস্তগামী মাছ’ প্রকাশিত হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্র থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে বর্তমানে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত।

Share Now শেয়ার করুন