হুমায়ুন আজাদ >> নজরুল, নজরুল >> অগ্রন্থিত গদ্য

0
469

কেউ প্রমাণ করছি, তিনি ইসলামের কবি, কেউ বলছেন তিনি মুসলমানের কবি। কেউ তাঁর কবিতার কোনো কোনো অংশকে অবাঞ্ছিত বলে ঘোষণা করছি। এ খণ্ডায়নী মনোভাব ত্যাগ করতেই হবে। নজরুলকে আমরা চাই সম্পূর্ণভাবে তাঁর শক্তি-দুর্বলতা, পাপপুণ্য সব কিছু আমরা চাই।

জরুলের জীবনটা একবার ভাবুন। এমন ভয়াবহ, তিলে তিলে পোড়ানো জীবনের কথা ভাবতেই আমার সমস্ত চেতনা একযোগে শিউরে ওঠে। বাল্যে তিনি রুটির দোকানে রুটি সেঁকেছিলেন, কিন্তু তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর জীবনটাও এক অদৃশ্য অশুভ চুল্লিতে সেঁক খেয়ে যাবে? যে বোহেমিয়ান আত্মবিনষ্টির বাতাস ঊনবিংশ শতকের মহাকবি মধুসূদনের জীবনকে উল্টে-পাল্টে দিয়েছিলো, তাই ঝড়ো বাতাসের মতো হানা দিলো নজরুলের মধ্যে, চারপাশে। আবাল্য তিনি ঝড়ো বাতাসে তাড়িত হলেন, এমন কি নিজেও হলেন ঝড়োবাতাস, উল্কা ইত্যাদি, তারপর নীরব। তাঁর বাল্য অস্থির, অস্থিরতর যৌবনকাল, এবং স্থানুস্থির পরবর্তী জীবন। বাস্তবিকই মধুসূদন ছাড়া, এমন চাঞ্চল্যকার ভয়াবহ জীবন বাংলা দেশে আর কেউ নিজের নিয়তি হিসাবে নিয়ে আসেননি। কবিতার যেমনি, তেমনি জীবনেও তিনি আমাদের স্থির, ধীরবহ বাঙালি জীবনে অস্থির, অধীর ব্যতিক্রম। তাঁর জীবনটাই একটি মস্ত বিদ্রোহ।

সাম্যবাদী চেতনা তিনি বিস্তৃত করে গেলেন বাংলা বর্ণমালার মাধ্যমে। আর তাই তাঁকে অবিস্মরণীয় করে রাখলো, রাখবে। তিনিই তাঁর সমকালীনদের মধ্যে সবচে’ মাটির কাছাকাছি গিয়েছিলেন।

কবি হিসাবে নজরুলের মূল্য অদ্যাপি অনির্ণীত। কতিপয় সমালোচকীয় করতালি এবং নজরুলের কতিপয় প্রখ্যাত পঙক্তির পৌনপুনিক উদ্ধৃতিই নজরুল সমালোচনার নিদর্শন হিসাবে আমরা আজো দেখে আসছি। কবি হিসাবে তিনি তুঙ্গস্পর্শী নন, একথা কবিতা পাঠক জানেন। কবিতাকে তিনি শুধু কবিতা করতে চাননি, প্রগাঢ় জীবন, জীবনের ট্র্যাজেডি এবং শিল্পের চরমোৎকর্ষ তিনি আমাদের দেননি। তিনি ভাবাবেগে উদ্দীপ্ত হয়েছেন আর সেই ভাবরাশি ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন আমাদের উদ্দেশ্যে। বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘প্রতিভাবান কিশোরের’ মতো তিনি সারাজীবন লিখে গেছেন। অনেকে কথাটি মেনে হয়তো নেবেন। আবেগ, বিদ্রোহ এবং উচ্চকণ্ঠতাই নজরুল ইসলাম। তিরিশোত্তর কবিরাই তাঁর সঙ্গে তুলিত হতে পারে না। তিরিশোত্তর কবিরা নতুন কবিতা সৃষ্টি করেছিলেন, নজরুল সেদিকে যাননি। তাঁর মানসিকতাই ভিন্ন। তিনি যেন কবিতাকে কবিতাই করতে চাইলেন না, তাকে করে তুললেন অন্য কিছু। রাজনীতি, উৎপীড়নের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি, জনগণের সপক্ষতা ইত্যাদি তিনি কবিতার মাধ্যমে ঘোষণা করলেন। নতুন কবিতা নয়, তিনি একটি নতুন চেতনা এদেশে নিয়ে এলেন। এই চেতনাটি আমাদের সাহিত্যে তিনিই সর্বপ্রথম আনলেন আর তাই তাঁকে অসাধারণ এবং প্রিয় করে তুললো। এই চেতনাটি গণমুখী সাম্যবাদী চেতনা। তাই সাম্যবাদী চেতনা তিনি বিস্তৃত করে গেলেন বাংলা বর্ণমালার মাধ্যমে। আর তাই তাঁকে অবিস্মরণীয় করে রাখলো, রাখবে। তিনিই তাঁর সমকালীনদের মধ্যে সবচে’ মাটির কাছাকাছি গিয়েছিলেন। উঁচু বেদীতে দাঁড়িয়ে বাণী বিতরণে অভ্যস্ত তিনি ছিলেন না, নিজেই কবিতাকে শ্লোগান করে রাস্তায় নেমেছিলেন। অর্থাৎ নজরুল আমাদের মহৎ সঙ্গী; শ্লোগানে, মিছিলে; শোভাযাত্রায়, শৃঙ্খলমোচনের শুভক্ষণে নজরুলবাদে, শক্তি আসবে না। তাই ভবিষ্যতের প্রেমিক যদি নজরুলের প্রেমের কবিতার ছোঁয়া এড়িয়েও চলে, সেই যখন হবে প্রেমিক, মুক্তিকামী, তখন তাঁর কণ্ঠে যে কবিতার পঙক্তি উচ্চারিত হবে, তার অধিকাংশই হবে নজরুল রচিত।

আমি নজরুলকে রাখতে চাই আমার সংগ্রামের সঙ্গী হিসাবে। আমি জানি, আমার দুর্বল অস্থি ভেঙে যাবে, যদি না তিনি থাকেন আমার সামনে নিজের দাবি আদায়ের সময়ে।

নজরুলের গানেরও আমি মুগ্ধ শ্রোতা। এই সুর বিস্ময়কর, যার সামান্য পরিমাণে হৃদয় আছে, তাকেও এই সুর সম্মোহিত করে প্রিয় যাদুকরের মতো। নজরুল তাঁর হৃদয়কে অনাবরণ মেলেছিলেন গানের কথায়, উড়িয়ে দিয়েছিলেন সুরে। জীবনে তিনি একটিমাত্র ক্ষেত্রেই সোনা-সোহাগার যথার্থ যোগ করতে পেরেছিলেন। তাঁর সুর আকুল করে, পাগল করে, দোলায়, ভোলায়। তার প্রেমের গানের কথাই বলছি। তিনি প্রেমের কবিতায় না হলেও প্রেমের গানের সুরে সমর্পিত হলে যে অনুভব সঞ্চারিত হয়, তা অলৌকিক।

নজরুল চর্চা আমরা এ পর্য়ন্ত যা করেছি, তা’ এমন কিছু মূল্যের বা গর্বের নয়। আমি এ পর্যন্ত যে কটি নজরুল বিষয়ক বই দেখেছি, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর নজরুল ইসলাম ও আধুনিক বাংলা কবিতা আতাউর রহমানের ‘কবি নজরুল’, মীর আবুল হোসেন সম্পাদিত ‘নজরুর সাহিত্য’ এবং পাকিস্তান পাবলিকেশন্স-এর ‘নজরুল পরিচিতি’। আমাদের সমালোচনা নজরুলের প্রকৃত মূল্য আজো আবিষ্কার করতে পারেননি। তাই নজরুলের উপর এ যাবৎ কোন উৎকৃষ্ট গ্রন্থ বের হয়নি। তাছাড়া আমরা কেবল কবিতাই নিয়ে ব্যস্ত। নজরুলের সেই আবেগী গদ্য গ্রন্থগুলি তাই আমাদের আলোচনার বাইরে থেকে যায়। তাঁর উপন্যাস, ছোটগল্প সাধারণ পাঠকের মতোই সমালোচকেরাও পড়েন বলে মনে হয় না। অথচ এ বিষয়ে আলোচনা অত্যাবশ্যক। অন্য একদিকে নজরুল যে আমাদের পাঠ দিতে পারেন, সেদিকটি আমরা খেয়ালের বৃত্তেই আনিনি। নজরুল নির্ভীক সাংবাদিক ছিলেন। তাঁর ‘যুগবাণী’, ‘রুদ্রমঙ্গল’ ইত্যাদি গ্রন্থে তিনি নির্ভীকতার যে উদাহরণ ছড়িয়ে গেছেন, সেই দিকে আমরা নজর কবে ফেলবো? আমরা কেউ কেউ নজরুলকে স্ব স্ব স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহার করছি। কেউ প্রমাণ করছি, তিনি ইসলামের কবি, কেউ বলছেন তিনি মুসলমানের কবি। কেউ তাঁর কবিতার কোনো কোনো অংশকে অবাঞ্ছিত বলে ঘোষণা করছি। এ খণ্ডায়নী মনোভাব ত্যাগ করতেই হবে। নজরুলকে আমরা চাই সম্পূর্ণভাবে তাঁর শক্তি-দুর্বলতা, পাপপুণ্য সব কিছু আমরা চাই।

আমরা যাঁরা নজরুলকে দেখিনি, তাঁদের কাছে নজরুল ইতিহাস। তবু আমি, নজরুলের যে কোনো প্রসঙ্গে তাঁর রোগমুক্তি না কামনা করে পারবো না। তাঁকে দেখ তে আমাদের কার না ইচ্ছে হয়?

সূত্র : ১৯৬৭ সালে একটি সাময়িকপত্রে প্রকাশিত

তীরন্দাজ-এ হুমায়ুন আজাদের অন্যান্য অপ্রকাশিত রচনা পড়ার জন্যে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন >>

হুমায়ুন আজাদের দুটি অপ্রকাশিত কবিতা
এডিনবরা থেকে
বেকনের মৌমাছিরা

আমাদের এই লেখাটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাইলে নিচের ফেসবুকে ক্লিক করে মন্তব্য করুন :
Teerandaz Antorjal
তীরন্দাজ Teerandaz

 

Share Now শেয়ার করুন